নমুনা

১.
রাত তখন প্রায় সাড়ে ৩ টার মত বাজে । পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে একটি পিরামিড আকৃতির মহাকাশযান প্রবেশ করল । মহাকাশ যানটির প্রধান স্ক্রীনে পৃথিবীর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য সহ বিভিন্ন বর্ণনা ভেসে উঠছে । প্রধান স্ক্রীনের নিচে থাকা কন্ট্রোল প্যানেলের উপর কিছু কর্ষিকার আন্দোলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে । এ কর্ষিকাগুলো আর কারো নয় ম্যাক্রনাম গ্যালাক্সীর পেট্রান গ্রহের অধিবাসী ক্রিটনের । কিছুক্ষনের মধ্যেই কর্ষিকা গুলো দিয়ে প্যানেলে কি একটা স্পর্শ করতেই যানটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর মাটিতে নেমে এল । কিউবিট্রন প্রসেসরে তৈরী কম্পিউটারের আওয়াজ স্পীকারে ভেসে এল ।

-মহামান্য ক্রিটন…আমি এই মাত্র পরীক্ষা করে দেখতে পেলাম এই গ্রহে অক্সিজেনের পরিমান খুব বেশী । যেটা আমাদের চামড়ার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে!!
-কোন অসুবিধা নেই…আমি নিজে যাচ্ছি না…জেরোক-৩৬ কে পাঠাব…তুমি কোন জীবিত প্রানিকে কাছাকাছি সনাক্ত করতে পেরেছ?
-এখনো নয় মহামান্য…
-তাড়াতাড়ি খুজে বের করো ।

এই কথাটা বলে প্যানেল থেকে খানিকটা ঘুরে দাড়াল ক্রিটন । পেট্রান গ্রহের অধিবাসীদের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষন করতে গেলে সর্বপ্রথম যেটা চোখে পড়বে সেটা হল ওদের উচ্চতা । আকৃতিতে ওরা কেউই ৪ ফুটের বেশী নয় । ক্রিটনের ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি । দেহের নিম্নভাগে পদচাকতি সহ ৩টি সরু পা রয়েছে । এছাড়া উদরগাত্র বলতে আমরা যা বুঝি তা ওদের প্রায় নেই বললেই চলে । পায়ের উপর থেকেই শুরু হয়েছে কর্ষিকার আবির্ভাব । এ কর্ষিকার সংখ্যা অনির্দিষ্ট । কর্ষিকার উপরে যেখানে মাথা থাকার কথা সেখানে রয়েছে ইংরেজী T এর মত আকৃতির মাংসপিন্ড । T এর দুই বাহুতে আছে দুটি আলোক সংবেদী চোখ । এই গ্রহের অধিবাসীদের মুখের প্রয়োজন হয় না । কারন তারা সরাসরি আলো থেকে শক্তি গ্রহন করে থাকে । চোখের কিছুটা নিচে, চামড়ায় আছে কয়েকটা ফুটো । এগুলো দিয়ে তারা যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে । পৃথিবী আক্রমনের পুর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে মূলত ক্রিটনকে পাঠানো হয়েছে । তাকে মিশন দেয়া হয়েছে যে, পৃথিবী থেকে পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রানীর নমুনা নিয়ে যেতে হবে । সেই প্রানীর নমুনা বিশ্লেষনপূর্বক অতঃপর পৃথিবীতে আক্রমন করা হবে । ক্রিটন তাদের মিশনের সফলতার ব্যাপারে ১০০ ভাগ নিশ্চিত । প্যানেলের আরেকদিকে স্পর্শ করতেই যানের ভিতরের আরেক পাশের দরজা খুলে গেল । সেখান থেকে বেরিয়ে এল পেট্রান গ্রহবাসীর উন্নত প্রযুক্তির চূড়ান্ত নমুনা……জেরোক-৩৬ । আধুনিক যুদ্ধরোবটের ক্ষেত্রে এটা তাদের সর্বশেষ সংস্করন । রোবটটির চলনাংগ বলতে কিছুই নেই । তার বদলে রয়েছে “নাট্রোনোম” আর “সিভিকিউল” এর জ্বালানি মিশ্রন দ্বারা চালিত শক্তিশালী ইঞ্জিন যা তাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখে । দেহের মধ্যভাগ তৈরী হয়েছে “ডেবরণ” নামক ধাতু দিয়ে । এই ধাতুর বৈশিষ্ট্য হল তড়িৎ কম্পাঙ্কের পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে নিজের আকার আকৃতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে । অর্থাৎ কোন অস্ত্র সম্পর্কে সব তথ্য জেনে সে অনুযায়ী কম্পাঙ্ক প্রদান করা হলে এই ধাতু সেই অস্ত্রের আকৃতি লাভ করবে । জেরোক-৩৬ এর ডাটাবেসে প্রায় শতাধিক অস্ত্রের তথ্য দেয়া আছে । যন্ত্রদানবটির মাথার জায়গায় আছে একটা স্ক্রীন । এই স্ক্রীন একই সাথে তথ্য প্রদর্শন এবং তাকে দেখতে সাহায্য করে । সে ক্রিটনের সামনে এসে তাকে সম্ভাষন জানায় । ক্রিটন তাকে উদ্দেশ্য করে বলে ।

-তোমাকে নিশ্চয়ই আর নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই…
-না মহামান্য ক্রিটন…
-ঠিক আছে…বেশ । তবে যাই করবে অত্যন্ত সাবধানের সাথে…যাতে কেউ আমাদের উদ্দেশ্য টের না পায় ।
-তাই হবে মহামান্য ক্রিটন ।

এমন সময় কম্পিউটারের শব্দ পাওয়া যায় ।

-মহামান্য ক্রিটন আমরা এখান থেকে ঠিক বেশ কিছু দূরে একটি আবাসিক এলাকার সন্ধান পেয়েছি । আমার সেন্সরের পাঠানো তথ্যানুযায়ী ওখানে অনেকগুলো প্রানের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে ।

ক্রিটন ও জেরোক-৩৬ এর মাঝে একটি হলোগ্রাফিক ম্যাপ আবির্ভুত হল । সেখানে পরিষ্কার ভাবে স্থানটি চিহ্নিত করা আছে । ক্রিটন বলে ওঠে…

-তাহলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় জেরোক-৩৬ । পলিট্রন দ্বারা তৈরী ব্যাগগুলো নিয়ে যাবে…এগুলো বেশ শক্ত ।
-জ্বি…মহামান্য ক্রিটন আমি অনেক আগেই সেগুলো নিয়ে রেখেছি ।

ক্রিটন কন্ট্রোল প্যানেলে ঘুরে একটা জায়গা স্পর্শ করতেই মহাকাশযানের দরজা খুলে যাবার শব্দ পাওয়া গেল । জেরোক-৩৬ সেই দরজার দিকে এগিয়ে যায় ।

২.
জায়গাটি একবার পরিদর্শন করছে জেরোক-৩৬ । তার শক্তিশালী ইঞ্জিন মিনিট পাচেকের মধ্যেই এখানে পৌঁছে দিয়েছে । অনেকগুলো জীবন্ত প্রানীর অস্তিত্ব ধরা পড়ছে ওর সেন্সরে । সবচেয়ে কাছের ঘরটির দিকে সে এগিয়ে আসল । পুরো এলাকাটি লোহার শক্ত বেষ্টিনী দ্বারা আবৃত । এতে তার কোন ভাবান্তর হল না । দেহের কিছু অংশ পরিবর্তিত হয়ে শক্তিশালী নাইক রশ্মি উৎপন্ন করল । যেটা দ্বারা অতি সহজেই সে বেষ্টনীর একটি অংশ কেটে ফেলতে সক্ষম হল । এবার সেই কাটা অংশ দিয়ে চেতনানাশক নিহিলিয়ন গ্যাস প্রবেশ করাল ।

৩.
মহাকাশযানের দরজা খুলে জেরোক-৩৬ কে আসতে দেখে নিশ্চিন্ত হল ক্রিটন । জেরোক-৩৬ এর পলিট্রনের ব্যাগেগুলোর ভিতরে সে কিছু একটাকে দাপাদাপি করতে দেখে । জেরোক-৩৬ এর সাথে ক্রিটন কথা বলে ।

-তাহলে…সফল হয়েছ?
-হ্যাঁ…মহামান্য ক্রিটন… ।
-তাহলে তো কাজটা তোমার জন্য সহজ ছিলো ।
-ঠিক তা নয়…নিহিলিওন গ্যাস প্রবেশ করানোর পর আমি ভেবেছিলাম সব প্রানী অচেতন হয়ে গেছে । কিন্তু ওদের সামনে গিয়ে দেখি কিছু তখনও জ্ঞান হারায় নি । তারা আমাকে আক্রমন করার চেষ্টা করলে আমি সিন্থানাইজার দিয়ে ওদের পরাস্ত করি ।
-ভাল করেছ ।
-মহামান্য…ক্রিটন আপনি কি এখন প্রানীগুলো দেখবেন…
-না । তার দরকার নেই…তোমার উপর আমার যথেষ্ট ভরসা আছে । আপাতত ওদেরকে একটা রুমে বন্দী করে রাখ । গ্রহে পৌঁছে সবাইকে নিয়েই দেখব ।

জেরোক-৩৬ অন্য রুমে চলে যায় । ক্রিটন তখন অনেক খুশি । এই কাজের জন্য তাকে অনেক সম্মানিত করা হবে । মহাকাশযান উড্ডয়নের জন্য সে প্যানেল স্পর্শ করল ।

৪.
পরের দিন সকালের ঘটনা । বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ভিতরের পাতায় এক অদ্ভুত খবর ছাপা হল । এসব পত্রিকার খবরে মূলত যা বলা হয়েছে তা হল-“পুরান ঢাকার বিখ্যাত ‘আবুল মুরগীর ফার্ম’ হতে কে বা কারা লোহার শক্ত বেষ্টনী কেটে ৮-১০টি মুরগী নিয়ে গেছে । উল্লেখ্য যে উক্ত এলাকার মুরগীর ফার্মে শতাধিক মুরগী ছিল । কিন্তু চোর শুধুমাত্র ৮-১০টি মুরগী কেন নিয়ে গেল তা বলতে পারছেন না কেউই । বিষয়টি সম্পর্কে ফার্মের মালিক আনুল মিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলে হলে তিনি জানান, ’এইডা লইয়া চিন্তা করবার কিছু নাই…যেইসব মুরগী বার্ড-ফ্লু আক্রান্ত হইত, সেইগুলারে ওইখানে রাখতাম । ওগুলা বার্ড-ফ্লু আক্রান্ত মুরগী ছিল!’তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিকটস্থ থানাইয় ডায়রী করা হয়েছে…………”

নমুনা” সম্পর্কে ২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন