রহস্যজনক মৃত্যু

১.
-এস, এস, সি পরীক্ষাতো সবে শেষ হলো । এখন কি করছিস?
-আপাতত করার মত কিছু পাচ্ছিনা ।
-শুনলাম, গোয়েন্দাগিরি করার ভুত নাকি মাথায় চেপেছে?
-না…মানে এই আর কি । কারও কোন সমস্যাই নেই । কিসের গোয়েন্দাগিরি?
এটা বলতে গিয়ে হালকা লজ্জা পেল তপু । গলার স্বর নিচু হয়ে এল । প্রশ্নগুলো করছিল তার আপন মামা শিহাবউদ্দিন আহমেদ । ফরিদপুর থানার বর্তমান এস, আই । ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি এক অন্যরকম ঝোক ছিলো তপুর । কোন না কোণ উপলক্ষ্য পেলেই তার বাবা তার জন্য বই নিয়ে আসতেন । ফলে বইয়ের প্রতি এক অন্য রকম ভালোবাসা তৈরী হয় তার । শ’খানেকের উপরে বই পড়া আছে তার । এর মধ্যে গোয়েন্দা গল্প অন্যতম । এসব বই পড়েই বুদ্ধিটাকে পাকিয়েছে । তাই গোয়েন্দাগিরি করার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিল । কিন্তু সময়, সুযোগ এবং কেস  এ  ৩টি জিনিসের সমন্বয় না থাকায় তা করে ওঠা হয় নি । ওরা থাকে চট্রগ্রামে । কিছুদিনের জন্য মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে সে । মামার অফিসে এসেছিল একটু ঘুরে দেখতে । মামার এসব প্রশ্ন শুনে কিছুটা বিরক্ত লাগছে । মামা যেখানে বসে আছে তার পিছনে দেয়ালে লেগে থাকা টিকটিকির দিকে সে তাকিয়ে থাকল ।
-তারমানে তোর কথা অনুযায়ী ক্রাইম করার মত এদেশে কোন বুদ্ধিমান পাবলিক নাই?
-না আমি কি তা বলছি নাকি?
এমন সময় মামার মোবাইলটা বিকট শব্দে বাজতে থাকল । কলটা রিসিভ করে কয়েকটা কথা বলার পরে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেলেন তিনি । কি সব মার্ডার, লেখক এ জাতীয় কয়েকটা কথা বলছেন তিনি । তপুর কাছে এসব বিরক্তিকর লাগতে লাগল । হাতঘড়িতে দেখল ১১.১৫ বাজে । মামার সামনে বসা চেয়ার থেকে উঠে দাড়াল । কি আশ্চর্য!মামা দেখি মোবাইলে কথা বলতে বলতে ওকে বসে থাকতে ইশারা করলেন । ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল রাকিব । প্রায় দেড় মিনিট পর মোবাইল রেখে শিহাব সাহেব তপুর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন ।
-কি হয়েছে, মামা?
-বেড়ালের ভাগ্যে বোধহয় এবার শিকে ছিড়ল ।
-মানে……?
-তুই কেমন গোয়েন্দা সেটা প্রমান হয়ে যেতে পারে ।
-কিভাবে?
-শফিক রেহমানকে চিনিস ?
-বিশিষ্ট শিল্পপতি শফিক আহমেদ?……
-তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে…
-what?…কি…কিন্তু?
-ফরিদপুর শহর থেকে অনেকটা দূরে তিনি থাকতেন । আমার বন্ধু মানুষ ছিলেন । হয়ত নির্জনতা পছন্দ করতেন দেখেই এত দূরে বিশাল বাড়ি তৈরী করেছেন । ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার । টাকার তো কোন শেষ ছিল না । এই ফরিদপুরেই ৪০-৫০ একর জায়গার মালিক তিনি ।
-টাকা থাকলে শত্রুর অভাব হয় না…
-হুম…এতদিন তো ভালই ছিলো…মোবাইলে যতটুকু জানতে পেরেছি…সকাল ১০.২৫ এর দিকে তার লিভিং রুমে লাশ দেখতে পায় তার চাকর ।
-রক্তাক্ত?
-নাহ…কোন রক্ত নাকি দেখতে পায় নি । যতটুকু ধারণা করা হচ্ছে হার্ট এটাক হয়েছে ।
-ও!কিন্তু এটা তো এমনি এমনি হতে পারে ।
-আরে নাহ । উনার শরীর তো তুই দেখিস নি । দেখে বয়স বোঝার উপায় নাই । এ বয়সেও ব্যায়াম করে বডিটাকে কেমন ফিট রেখেছে গেলেই দেখতে পাবি । প্রেসার, গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস কিচ্ছু ছিলো না…আর তদন্ত করলেই তো বুঝবি এটা সাধারন মৃত্যু নাকি অন্য কিছু…তুই আবার কেস নিতে ভয় পাচ্ছিস নাতো?
শিহাব সাহেব মৃদু হাসছেন ।
-নাআআআ…ভয় কেন পাব?এখান থেকে ওখানে পৌছুতে কতক্ষন লাগে?
-বেশী না…সিএনজি করে গেলে আধাঘন্টার মত…এখন যাবি?
-গেলে চলো ।
মামার অপেক্ষা না করে তপু থানা থেকে বেড়িয়ে এল । পাশে থাকা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে একটা নোটপ্যাড এবং একটা কলম কিনল । সবার গুরুত্বপুর্ন কথা নোট করতে হবে । হাজারহোক ধরা যায় এটা তার প্রথম কেস । বিফল হওয়া যাবে না কিছুতেই ।

২.
মামার গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখছিল তপু । দুর-দুরান্ত পর্যন্ত শুধু সবুজের বিস্তৃতি । হঠাৎ মামার দিকে ঘুরে প্রশ্ন করে বসল ।
-মামা, শফিক সাহেব তো তোমার ভাল বন্ধু ছিলো…তাই না?
-হুম…
-তাহলে তার পরিবার সম্পর্কে কিছু বল…শুনি ।
শিহাব সাহেব কিছুটা আমতা আমতা করছিলেন ।
-মামা, কোন সমস্যা?
-না মানে…আসলে তুই ত এখন কেসটা ইনভেস্টিগেট করবি তাই তোকে সব খুলে বলতে হবে…কিন্তু কথাগুলি খুবই গোপন…নেহাত শফিক আমার বন্ধু ছিল তাই আমাকে বলেছে ।
-কি হয়েছে…?
ইতিমধ্যে নোটপ্যাড খুলে তপু নোট করা শুরু করে দিয়েছে ।
-ব্যাপারটা তাহলে তোকে অনেক আগে থেকে বলতে হবে । শফিকের বাবা নিয়াজ মিয়া অনেক বড় জমিদার ছিলো…নাম হয়ত শুনে থাকবি । ছোটবেলায় হাইস্কুলে শফিক আর আমি একই স্কুলে লেখাপড়া করি । ও আমার চেয়ে অনেক মেধাবী ছিলো এবং উচ্ছৃংখল ও । হাইস্কুল শেষে ভাল রেসাল্ট করায় ও ঢাকার ভাল কলেজে ভর্তি হয় । কিন্তু আমি ফরিদপুরেই থেকে যাই । এখানকার কলেজে ভর্তি হই । কলেজে পড়া অবস্থায়ই ওর একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরী হয় । মেয়েটা ওর ক্লাসমেট ছিলো । ‍‌‍‌‍‌ধীরে ধীরে ওদের সম্পর্ক গাঢ় হয়ে উঠল । একসময় শফিকের পরিবার ব্যাপারটা জেনে যায় । যেহেতু মেয়েটার পরিবারও অবস্থাসম্পন্ন ছিলো । তাই দুই পরিবার মিলে কথা বলে শফিকের সাথে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিল ।
-কলেজে পড়া অবস্থাতেই…!
-হ্যাঁ…তোকে তো মেয়েটার নামই বলা হয়নি । নাম ছিল শিরিন । বিয়ের প্রায় ৪ বছর ওরা খুব সুখে কাটায় । এর মধ্যে শফিক দুই যমজ মেয়ের বাবা হয় । এবং বাবার জমিজমার পাশাপাশি ব্যবসার দায়িত্বও কাধে তুলে নিয়েছে । ওদের সুখের বাগানে ঢুকে পড়ে অশান্তি । মেহেরীন নামের একটা মেয়ে ওর ব্যবসার দেখাশোনা করত । একসময় তার সাথে রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে শফিক । ফলে যা হবার তাই হয়…সংসারে অশান্তি । শফিক বেশীরভাগ সময়ই বাইরে মেয়েটার সাথে কাটাত । একসময় এসব কিছু শিরিনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় । এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া হয় তাদের মাঝে ।
-দাড়াও দাড়াও তুমি এতকিছু পরিষ্কারভাবে কি করে বলছ?এটা অনেক দিন আগের কথা ।
-শফিক বিয়ে করে ফরিদপুরে ফিরে আসার পর ওর প্রতিটা মুহূর্তের সঙ্গী ছিলাম আমি । ওদের ঝগড়াটা বন্ধ করার চেস্টাও করেছি । কিন্তু পারলাম না । শিরিন এ আঘাত মেনে নিতে পারে না । তাই সে ডিভোর্স নেয়ার সিধান্ত গ্রহন করে । শফিকের দুই মেয়ের নাম ছিল টুম্পা এবং রুম্পা । টুম্পার চেয়ে শফিক রুম্পাকে বেশী পছন্দ করত । তাই ডিভোর্সের সময় শফিক একপ্রকার জোর করেই রুম্পাকে নিজের কাছে রেখে দেয় । শফিকের পরিবার শিরিনকে আরও ১ লাখ টাকা অতিরিক্ত দেয় । শিরিনের সাথে তাদের এই চুক্তি হয় যে শিরিন টুম্পাকে নিয়ে অনেকদুর চলে যাবে । এবং কোনদিন শফিকের পরিবারের সামনেও আসবে না । শিরিন সেটা মেনে নেয় ।
-এত সহজে…?শিরিনের পরিবার থেকে কিছু বলে নি?
-শিরিনের বাবা এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না । তাই তিনি কাউকে কিছু করতে দেন নি ।
-শিরিন তাহলে তার বাবার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো?
-না ও টুম্পাকে কোথায় নিয়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল…কেউ আর খুজে পায় নি । এমনকি শিরিনের বাড়ির লোকেরাও না…
-মানুষজন ঘটনাটা জানত না…?
-যে কয়েকজন জানত তাদের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে । আস্তে আস্তে লোকজন ঘটনাটা ভুলে যায় ।
-ও…পরে শফিক সাহেব মেহেরীনকে বিয়ে করে?
-হ্যা…মেহেরিনের ঘরে দুটি ছেলে হয় । একটার নাম সিফাত আহমেদ আরেকটার নাম রাব্বি আহমেদ । সিফাত ছোট রাব্বি বড় ।
-রুম্পার কি হলো?
-ও বহাল তবিয়তেই আছে । এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত কৃষিবিজ্ঞানের উপর গ্রাজুয়েট করেছে । আর রাব্বি একটা কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ফার্মাসিটিকাল কোম্পানিতে আছে । সিফাত একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ২য় বর্ষে লেখাপড়া করছে ।
-আর মেহেরীন…?
-বছর দুয়েক আগে স্ট্রোক করেছিলেন । তখন মারা গেছেন ।
এরপর আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না তপু । ২ মিনিটের মাথায় ওরা ওদের গন্তব্যে পৌঁছে গেল । বাড়িটার ডিজাইন দেখে তপুর খুব ভালো লেগে গেল । বিশাল এলাকা জুড়ে বাড়ি বানিয়েছেন শফিক রেহমান । তার চারপাশের পাঁচিল আরও বিশাল এলাকা জুড়ে । অর্থাৎ ভিতরে হাটাচলা করার মত অনেক জায়গা । অনায়াসে ৪-৫টা সুইমিংপুলের জায়গা হয়ে যাবে । সম্ভবত বাড়িটি দোতলা । এর মাঝে তপুর মামা তাড়া দিলেন ।
-চল আগে ডেডবডিটা দেখে আসি…আমি কাউকে ওই রুমে ঢুকতে বারণ করেছিলাম । ওরা দুজনে বাড়িটির ভেতর প্রবেশ করল ।


৩.
ডেডবডি চেক করা হয়ে গেছে । কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন নেই । ব্যাপারটা অবাক লাগে তপুর । তপু এবং শিহাব সাহেব নিচতলায় শফিক সাহেবের লিভিংরুমে দাড়িয়ে আছে । ডেডবডিটা পড়ে ছিল পড়ার টেবিলের পাশে । তারসাথে একটা চেয়ার ও উল্টে ছিল । অর্থাৎ তপু ধরে নিল পড়ার টেবিলে বসে কিছু করার সময়ই ঘটনাটা ঘটেছে । টেবিলের উপর রাখা আছে কিছু বই আর একটা ঝর্না কলম এবং তার দোয়াত । ”শফিক সাহেব ঝর্না কলম ব্যাবহার করতে পছন্দ করতেন”, বললেন শিহাব । টেবিলের উপর সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে খানিকটা হতাশ তপু । হঠাৎ কি মনে হতেই টেবিলের কাছে এসে সে নিচের দিকে ঝুকে পড়ল । কিছু মনে হয় দেখতে পেয়েছে তপু । ডেডবডি থেকে ২-৩ হাত দূরে থাকা কাঠের আলমারির কাছে গিয়ে তার নিচে হাত ঢুকিয়ে দিল । হাসি হাসি মুখে বের করে আনল একটা সোনালী মলাটের ডায়রী । ওর মামা পুরো অবাক ।
-তুই কিভাবে বুজলি………?
-কেউ যদি টেবিলে থাকা অবস্থায় ওভাবে পড়ে যায় তাহলে তার হাতে থাকা জিনিস এতটুক দূরে যেতেই পারে…তাই আন্দাজ করেছিলাম ।
-আচ্ছা আর জ্ঞান দিতে হবে না… । নে ডায়রীটা খোল । ডায়রীটা পড়তে গিয়ে ওরা বুঝল এটা শফিক সাহেবের ব্যাক্তিগত ডায়রী । নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারগুলোই লেখা আছে এতে । কিন্তু ডায়রীর শেষের পৃষ্ঠার লেখাটা দেখে ওরা দুজনেই অবাক । ডায়রীর দুই পাতা জুড়ে বড় করে কাপা কাপা হাতে লেখা আছে একটা শব্দ । শব্দটা হল-“আয়না” । লেখাটা দেখে তপু কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল । এ পর্যন্ত শফিক সাহেব সম্পর্কে যা জেনেছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরত্বপুর্ন হল, ”সকালবেলা উঠেই তিনি ডায়রী লিখতেন” । তার মানে সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু করার আগেই… । ঘরের কেউই তার মৃতুর জন্য দায়ী এই ব্যাপারে তপু ও মামা মোটামুটি নিশ্চিত । কারন এর আশেপাশে আর কোন বাড়িও নেই । নেহাত শফিক সাহেব নির্জনতা পছন্দ করতেন নয়তো এমন জনমানবহীন এলাকায় কেউ বাড়ি বানায় না । অনুসন্ধিৎসু চোখগুলো শফিক সাহেবের রুমের উপর আরও  একবার ঘুরিয়ে আনল । রুমটা তেমন বড় নয় । ঘরে আসবাব পত্রও তেমন নেই । পরস্পর বিপরীত দিকের দেয়ালে দুটো জানালা । একটি জানালার কাছে শফিক সাহেবের রিডিং টেবিল এবং অপরটির পাশে তার শোয়ার খাট । খাটের পাশেই আলমারি । এগুলো ছাড়া আসবাবপত্র বলতে আছে একটি রকিং চেয়ার । তপুর মামার সাথে আসা পুলিশগুলো আরেকবার পুরো ঘর তল্লাশি করেও কিছুই পেলো না । তপু কিছুটা বিমর্ষ । এতক্ষনে মুখ খুললেন শফিক সাহেব ।
-কিরে…কি মনে হয়?
-হু…ঠিক বুঝতেছি না…ডায়রীতে লেখা আছে আয়না কিন্তু…কোন আয়নাই তো এখানে নাই ।
-আরে তুই আয়নাকে এত গুরুত্ব কেন দিচ্ছিস…হয়ত ওটা এমনিতেই লিখেছে ।
-না, মামা মানুষ মরার আগে মজা করে না …তাছাড়া লেখার স্টাইলটা দেখেছ…এটার নিশ্চয়ই কোন অর্থ আছে?
-আয়না থাকলে না তার অর্থ…আয়নাই তো  নাই……
-মামা, অন্য রুমের কথা বলে থাকতে পারে ।
-হ্যা…এটা অবশ্য হতে পারে…অন্য রুমে যেতে চাস?
-চলো…

মামা রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন । তপুও বেরিয়ে যাবে এমন সময় একটা জিনিস দেখে ও থামতে বাধ্য হল ।

-মামা…এই মামা…এদিকে আসো তো আরেকবার ।
-আরে আবার কি হল…?
-আসো না……

মামা রুমে ফিরে আসতেই তপু রিডিং টেবিলটির দিকে নির্দেশ করল ।

-কি হয়েছে?
-দোয়াতটা দেখেছো?
-এটাতে দেখার মত কি আছে?
-ওটার ঠিক পাশে একটা মরা মাছি…
-মরা মাছি থাকলে আমাদের কি…?
-তুমি কি সব জায়গায় মরা মাছি পড়ে থাকতে দেখো…?
-না…কেন?

মামার নির্বুদ্ধিতায় হতাশ হল তপু ।
-এই রুমে যেহেতু কেউ আসে নাই তার মানে মরা মাছিটা কেউ আনে নাই । আর একটা মাছি মরার পরে এই রুমের আসার সম্ভাবনা নাই কারন জানালা দরজা বন্ধই ছিল । মাছিটা এই রুমের কোন কিছুর কারনে মারা গেছে ।
-কেউ চাপড় দিয়ে মেরে থাকলে…
-আমরা আসার আগে কেউ এই রুমে আসে নাই…অতএব সেটা হতে পারে  না ।

তপু পকেটে থাকা ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা বের করে আনল । এটা সবসময় পকেটে রাখে সে । গোয়েন্দাগিরির জন্য না, কোন কিছুতে আলো ফোকাস করে আগুন ধরাতে প্রচন্ড ভাল লাগে তার । ওই ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা দিয়ে মাছিটাকে ভাল করে দেখতে গিয়েই বুঝতে পারল । মাছিটার পায়ে কালির দাগ স্পষ্ট । কাছেই কালির দোয়াত তাই বুঝতে অসুবিধা হল না তপুর । কালির দোয়াতটা ভাল করে দেখার জন্য কাছে নিল । কেমন যেন মাথাটা টলে উঠল তার । চারপাশের সব কিছু কেমন যেন অস্পষ্ট হতে লাগল । এরপর শুধুই অন্ধকার…………

৪.

রফিকের সাথে ঘুড়ি প্রতিযোগিতায় নেমেছে তপু । কোনভাবেই রকিকের ঘুড়িকে কাটতে পারছে না । এতক্ষনে রফিকের ঘুড়িটাকে বাগে পেল ।
রফিকের ঘুড়ি যেই কাটতে যাবে অমনি কোত্থেকে যেন আরেকটা বড় ঘুড়ি এসে তার ঘুড়িটাকে কেটে দিল । কেন জানি তার কান্না পাচ্ছে । ”তপু…এই তপু”, মামার ডাকে তপু বাস্তব জগতে ফিরে এল । কিছুসময়ের জন্য বুঝতে সমস্যা হল যে সে কোথায় আছে । বেশ আলিশান একটা খাটে শুয়ে আছে এই মুহূর্তে । পাশে তার মামা বসা । চারপাশে আরও কয়েকজনকে দেখল । এদের কাউকেই তপু চিনে না ।

-মামা…আ…আমি এখন কোথায়?
-তুই এখন সিফাতের ঘরে ।
-সিফাত…?
-সেকি তোর মনে নেই?…ওই যে মরা মাছি…দোয়াত কলম ।

চট করে সব কিছু মনে পরে গেল তপুর । মামা ওর পিঠ চাপড়ে দিল ।

-তোর জন্য আজ কেসটা সলভ হয়ে গেল ।

তপু তো পুরো অবাক ।

-মানে…?
-কেস শেষ…হ্যাপি এন্ডিং…

মামার দন্ত বিকশিত হাসিতে সন্তুষ্ট নয় তপু ।

-কিভাবে কেস শেষ হয়ে গেল ।
-তুই যে দোয়াতটা হাতে নিয়েছিলি ওটাতেই কোন প্রকার বিষ ছিল…যার ফলে তুই এখন বিছানায় ।
-মানে…বিষটা এতই মারাত্মক যে শুঁকলেও ক্ষতি করে?
-হ্যাঁ…
-সেটা না হয় বুঝলাম কিন্তু তুমি কি করে বুঝলে যে কালপ্রিট কে?
-আরে গাধা…এটাও বুঝলিনা…বিষ সম্পর্কে কে ভাল জানবে?
তপুর মনে পড়ল শফিক সাহেবের বড় ছেলে রাব্বি আহমেদের কথা । …কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার!

-এখন বুঝেছিস?
-হ্যা…কিন্তু বিষ থাকার অর্থ এই না যে এর পিছনে রাব্বি আহমেদের হাত আছে ।

মামা কিছুটা রেগে গেলেন ।

-তাহলে বল কার হাত আছে?
-সেটা এখনো ঠিক করে বলা যাবে না । …তাছাড়া…আয়নার ব্যাপারটা…?
-দেখ…আমি এত ভ্যাজালে যাব না । তোরা আজকালকার পোলাপান…কথা বেশী প্যাচাস । আমি বিষ আমাদের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি । ওদের এনালাইসিস শেষ হতে  ১০-১১ ঘন্টা লাগবে । এর মধ্যেই রাব্বিকে আমরা ওর অফিস থেকে ধরে ফেলতে পারব ।
-কিন্তু…?
-কোন কথা না…বিষ এনালাইসিস করলেই বুঝতে আর কোন সমস্যা হবে না…
-বিষটা যে রাব্বি আহমেদই রেখেছে এর কোন…

হঠাৎ তপু লক্ষ্য করল ওর পাশ থেকে একটা মেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে । কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল সে । মামা তপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন ।

-ও, হ্যা তোকে তো পরিচয় করাতেই ভুলে গেছি । ইনি মিসেস রূম্পা আহমেদ ।

তপু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে । মেয়েটা অসম্ভব রকমের সুন্দরী । মাথার কাল রঙের চুলগুলো বিদেশী স্টাইলে ছাঁটা । বয়স ২৪-২৫ হবে । উচ্চতা ৬ ফিটের কাছাকাছি । এক কথায় অসাধারন!মেয়েটা হ্যান্ডশেক করার জন্য যখন বাম হাত বাড়িয়ে দিল ততক্ষনে তপু নিজেকে সামলে নিয়েছে ।

-হাই…আমি রূম্পা । শফিক আহমেদের মেয়ে…রাব্বি ভাইয়ার একটা জরুরী কাজ পড়ে যাওয়ায় অফিসে যেতে হয়েছে । তাই উনি এখানে নেই ।
-আমি তপু…মামার সাথে এসেছিলাম আপনার বাবার কেসটার ব্যাপারে তদন্ত করতে ।
-হ্যা…এজন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ যে আপনি কেসটা সমাধান করে ফেলেছেন । ভাইয়া যে এ কাজ করবে এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি…

কথা শেষ না করতেই কেঁদে দিল রূম্পা । তপুর খুব খারাপ লাগছে কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছেনা । মামা ব্যাপারটা সামাল দিলেন ।

-নে…তপু অনেক কাজ পরে আছে ওঠ…

তপু বিছানা থেকে উঠে দাড়িয়ে চারপাশটা একবার ঘুরে দেখল । সিফাতের রুম এটা । রুমের একপ্রান্তে বই রাখার বিশাল তাক । তার পাশেই জায়গা  করে নিয়েছে একটি ডেক্সটপ কম্পিউটার । সেটার উপরেই রাখা একটি ল্যাপটপ । তার আশেপাশে কিছু বই আগোছালো করে রাখা । হালকা টুকিটাকির মাঝে একটা ছোট হাত আয়না দেখে তপু এগিয়ে গেল । কিন্তু আয়নাটা ওকে হতাশ করল যখন ওতে কিছুই পেলো না । ওর মামা প্রায় বিরক্ত এগুলা দেখে ।

-তপু চল তো…… অনেক হয়েছে!

মামার সাথে সাথে সিফাতের রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তপুর কি যেন মনে পড়ে গেল । রুম্পার উদ্দেশ্যে ঘুরে দাড়িয়ে বলল, ”আপু আপনার রুমটা কি একটু দেখতে পারি?”

৫.

নাহ…জীবনের ১ম কেস এত নিরামিষ মার্কা হবে এটা তপুর চিন্তাতেও আসেনি । মামার অমতে রূম্পা আহমেদের রুমেও খুজে দেখেছে । কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু পায়নি । কেন জানি হিসাব মিলাতে কষ্ট হচ্ছে । যদি ধরে নেয়া হয় রাবিব আহমেদ এ কাজটা করেছে তবে এত কাঁচা কাজ কেন করবেন উনি?দোয়াতটা সরিয়ে রাখলেন না কেন?গভীর ভাবনায় ডুবে গেল সে । মামার ডাকে চমকে গেল তপু ।

-কিরে…গাড়ি থেকে নামবি না?…বাসায় তো এসে গেলাম ।
-ও…হ্যা…

কখন যে বাসায় পৌঁছে গেছে সেদিকে একদম খেয়াল ছিলো না ওর ।


তপুর মামার পরিবারের সদস্য সংখ্যা মাত্র ৩ জন । তপুর মামা-শিহাবউদ্দিন আহমেদ, মামী-লায়লা হক এবং ৫ম শ্রেনীতে পড়া তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে রিনি । সন্ধ্যা ৭.৪৫ এর মত বাজে । তপুর মামী সেই ৬ টার দিকে রিনিকে নিয়ে নাচের ক্লাশে গেছে কিন্তু এখনো ফেরেনি । খাটে শুয়ে আছে তপু । হাতে একটা বই ধরা । ও তিন গোয়েন্দার বই পড়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পড়ায় মন দিতে পারছেনা । কেন জানি মনে হচ্ছে কিছু একটা মিস করেছে ও । ”ধুরর…কিছুই ভালো লাগছে না । ”, ভাবে তপু । শেষ পর্যন্ত তপু এই সিদ্ধান্ত নিল যে এই বাসায়(মামার বাড়িতে) আর থাকবে না । নিজের বাসায় চলে যাবে । যতদিন এখানে থাকবে ওই কেসটার ব্যাপারে মনে পড়বে আর খারাপ লাগবে । নাহ, আজকে মামা ঘরে আসলেই ওকে কথাটা বলে ফেলতে হবে । এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ শোনা গেল । নিশ্চয়ই মামী চলে এসেছে এই ভেবে তপু দরজা খুলে দেবার জন্য উঠে যায় । দরজা খুলে মামাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায় সে । মামার এত তাড়াতাড়ি আসার কথা না । মামাকে ভিতরে ঢুকতে জায়গা করে দিয়ে নিজের রুমে ফিরে যায় ।


কিছুক্ষন পর তপু মামার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় । শিহাব সাহেব বিছানায় বসে টিভি দেখছিলেন । তপুকে আসতে দেখে ডাক দিলেন ।

-তপু…এইতো এইমাত্র ভাবছিলাম তোর কাছে যাব । …টিভি দেখবি?…আয় ।

তপু মামার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ।

-মামা…তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো…

তপু কথা শেষ না করতেই মামা ওকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দেন ।

-আগে আমার কথা শোন…তারপর তোরটা শুনছি ।

মামাকে কেমন যেন অস্থির দেখাচ্ছে । তপু মনে হয় বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা ।

-মামা, ফরেনসিক ল্যাব কি রিপোর্ট দিল?
-অ্যাঁ…হ্যাঁ…সেই ব্যাপারেই বলব তোকে । তোকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমিতো পুলিশ ফোর্স নিয়ে চলে গেলাম রাব্বি কে ধরতে । যথাসময়ে পাকড়াও করলাম ওকে । পুলিশেরা  ওকে থানাতে নিয়ে গেল । এরপর আমি আর ওর কোন খোজ নেই নাই । কিছুক্ষনের মধ্যেই বলতে গেলে বেশ তাড়াতাড়ি ফরেনসিক ল্যাবের রিপোর্টটা আমার হাতে চলে এল । ওটা দেখে আমি অবাক…
-কি?…কি ছিলো ওটাতে?
-লেখা ছিল এই বিষটার ব্যাপারে ওদের ডাটাবেসে কোন তথ্য নাই । এই ধরনের কম্পাউন্ড ওদের কাছে নতুন ।
-অদ্ভুত ব্যাপার……!
-হ্যা…এবং আরও একটা ব্যাপার হল  রাব্বিকে প্রাথমিকভাবে প্রচুর মারধর করা হয়েছে কিন্তু ও বলছে ও কিছু জানে না ।
-তো…?
-আমরা ওর অফিসে খোজ-খবর নিলাম কিন্তু এ জাতীয় কোন কম্পাউন্ড নাই……
-আমি জানতাম এরকমই হবে……তো এখন রাব্বি আহমেদকে ছেড়ে দাও…
-সমস্যা তো এই জায়গায়ই…কেসটা এখন আমার হাতে নাই…আমার উপরের লেভেলে চলে গেছে ।
-দোয়াতে কি কোন ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাও নাই?
-পেয়েছি…কিন্তু সেটা শফিকের…আর কারো না । আমি যদিও বুঝছি রাব্বি নির্দোষ সবাই তো বুঝবে না । আর বাংলাদেশের রিমান্ড তো বুঝিস!হয়ত এক সময় স্বীকার করে বসবে খুন ওই করেছে ।
-তো আমাকে এখন কি করতে বলো?

তপু যদিও জানে তার কি করতে হবে তবু প্রশ্নটা করল । মামাকে কিছুটা বিব্রত মনে হল ।

-দেখ, কোর্ট দুয়েকদিনের মধ্যে ওর জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারে । এর আগেই আমাদের যা করার করতে হবে ।
-মানে…?

মামা কিছুটা রেগে গেল ।

-দেখ তপু…বুঝেও না বোঝার ভান করবি না । তুই কালকে থেকে তোর ইনভেস্টিগেশন আবার চালু কর ।
-কিন্তু…
-দেখ দাম বাড়াবি না…এই ইনভেস্টিগেশনে যা খরচ লাগে আমার থেকে নিস…এবার খুশি?
-ঠিক আছে…দেখি ।

মামার রুম থেকে উঠে তপু নিজের রুমে যাচ্ছে । মুখে এ কথা বললেও সে ভিতরে ভিতরে খুব খুশি । রুমে ঢুকে তিন গোয়েন্দার বইটাকে খাট
থেকে সরিয়ে রাখল । প্যন্টের পকেটে থাকা নোটপ্যাড হাতে নিয়ে শুয়ে শুয়ে কি জানি হিসাব কষতে থাকল ।

৬.

-তপু…এই যে তপু উঠবি না?

মামার ডাকে ঘুম ভাঙে তপুর । হাতে নোটপ্যাড নিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি । বিছানা থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙে । তপুর মামী ডাক দেয় ।

-তপু…তাড়াতাড়ি খাবার টেবিলে আয়…
তপু হাত-মুখ ধুতে বেসিনে যায় । হাত মুখ ধুতে ধুতে সে বিরানীর গন্ধ পায় । খাবারের টেবিলে এসে গন্ধের সত্যতা বুঝতে পারে তপু । মামী একটা প্লেটে অনেকগুলা বিরানী ঢেলে তপুর সামনে রাখে । হঠাৎ চমকে উঠে তপু ।

-সেকি?…মামী এতগুলো বিরানী কার জন্য?
-কার জন্য আবার…তোর জন্য…
-এতগুলা…
-হ্যাঁ এতগুলাই…কালকে রাতে তো কিছুই খাস নি । কালকে রাতে রিনিকে নিয়ে ফিরতে একটু রাত হয়ে গেছিল…রিনির এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম । বাসায় এসে দেখি তুই ঘুমিয়ে আছিস…তাই আর জাগাই নি । এগুলা সব খাবি ।

তপু ভাল করেই জানে এখন আর মামীর সাথে তর্ক করে লাভ নেই । তাছাড়া ক্ষুধাও লেগেছে খুব । কথা না বাড়িয়ে সে খেতে শুরু করে । এমন  সময় পাশের চেয়ারে বসা তার মামাত বোন রিনি কথা বলে ।

-ভাইয়া, তুমি নাকি গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছ?
-অ্যাঁ…হ্যা…কে বলল তোকে?
-বাবা বলেছে । তুমি আমাকে বললা না…?
-আচ্ছা বাবা…বলার টাইম পেলাম কোথায়?এখন তো জেনেছিস…হয়েছে?
-না…এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে ।

তপুর খুব ভাল বন্ধু রিনি । ওরা আগে ওয়াদা করেছিল যে যাই করবে দুজনেই জানবে ।

-এটা কোন কথা হল, রিনি…
-না..ভাইয়া তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে ।
-আচ্ছা…ঠিক আছে বল কি শাস্তি?
-আব্বুর কাছে শুনলাম তুমি নাকি গোয়েন্দাগিরির জন্য কোথায় যাচ্ছ?…আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে ।

এতক্ষনে রিনির দুরভিসন্ধি সম্পর্কে তপু পরিষ্কার হয়ে গেছে । এটা সে কোনমতেই হতে দিবে না ।

-না…কক্ষনো না…মরে গেলেও না…
-না । আমি যেটা করতে বলেছি সেটা করতেই হবে ।
-জীবনেও না…

এমন সময় মামা পেপার নিয়ে এসে খাবার টেবিলে বসলেন ।

-কি হয়েছে । এত চেঁচামেচি কিসের?
-দেখ আব্বু, আমি তপু ভাইয়াকে বলেছি আমাকে তার সাথে নিয়ে যেতে…কিন্তু তপু ভাইয়া নিতে চাচ্ছে না ।
-মামা ওখানে যাওয়া রিনির জন্য নিরাপদ হবে না…

তপু নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করে । রিনি একটা কথাই বলে ।

-আব্বু…প্লিজ…
-রিনি যেহেতু এত করে বলছে ওকে নিয়ে যা না তপু…কি আর হবে?
-কিন্তু মামা, রিনির লেখাপড়া…?
-আজ শুক্রবার সেটা খেয়াল আছে?

শেষ চালটাও তপুর হাত ফসকে বেড়িয়ে গেল । এখন তপুর সামনে দুটো পথ খোলা । বসে বসে আফসোস করা নয়তো রিনিকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া ।


শফিক সাহেবের বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে লনে প্রবেশ করতেই রিনি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল । এত সুন্দর লন সে আগে কখনো দেখেনি । রিনির এ আচরনে তপুকে কিছুটা বিরক্ত মনে হল । তার ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে এল । রিনিকে তার মুখোমুখি দাড় করিয়ে বলল-

-রিনি আমরা এখানে একটা কেসের ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছি…তুই যদি এ জাতীয় আচরণ করিস তাহলে কিন্তু সব পন্ড হয়ে যাবে ।
-তাহলে…আমি কি করব?…
-চুপচাপ আমার সাথে থাকবি…আর এ সময় আমার সাথে কোন ফাজলামো করবি না । তাহলে ওদের কাছে আমার মুল্য কমে যাবে ।
-আচ্ছা…ঠিক আছে ভাইয়া!!

তপু ডান হাতে ওর হাত চেপে ধরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো । ও মত বদলেছে । ভেবেছিল শুরুতে বাড়িতে ঢুকে যাবে কিন্তু এখন ইচ্ছা করছে বাইরের লন পুরোটা ঘুরে দেখতে । রিনিকে নিয়ে লন ঘুরে দেখতে দেখতে  বাড়িটার একটা হালকা লে-আউট তপু তার নোটপ্যাডে নিয়ে নিচ্ছে । এখনে আসার আগে ওর মামার কাছ থেকে যতটুকু জেনেছে, নিচতলায় ৪ টা রুম । বাড়িতে ঢুকতে যে দুটো রুম পড়ে তার একটাতে শফিক সাহেব এবং আরেকটাতে তার মরহুম স্ত্রী মেহেরীন আক্তার থাকতেন । পিছনের দিকে থাকা আর দুটো রুমের মধ্যে একটা কিচেনরুম ও আরেকটা গুদামঘর । হঠাৎ তপুর মোবাইল বেজে এঠে । মোবাইলের স্ক্রীনে মামার নাম দেখে তপু কলটা রিসিভ করে ।

-হ্যালো…তপু…?
-হ্যা…মামা বলো ।
-তোকে কয়েকটা ব্যাপার বলতে ভুলে গিয়েছিলাম…
-বলো…
-আরও একটা ঘটনা ঘটেছে… । আজকে আমি ফরেনসিক ল্যাবে গিয়েছিলাম । ওদেরকে আরেকবার বিষটা টেস্ট করতে বললাম ।
…অদ্ভুত ব্যাপার হলো ওরা টেস্ট করে কোন কম্পাউন্ডই পায়নি ।
-বলো কি?
-হ্যা…এটাই সত্যি ।
-তাহলে রাব্বি আহমেদকে ছেড়ে দাও…
-সেটা সম্ভব না…কোর্ট ওর জন্য আজকে আর কালকে এই দুইদিন রিমান্ড মঞ্জুর করেছে । আর প্রমান গায়েব হলে কি হবে?…তোর নিশ্চয়ই  মনে আছে যে দোয়াত নাকের কাছে নিতেই তুই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলি?
-হ্যা…কেন?
-ওরা দোয়াতে বিষ আছে এটা প্রমানের জন্য তোকে সাক্ষী হিসেবে ব্যাবহার করতে দ্বিধা করবে না ।
-তারমান…আমাদের হাতে সময় আছে মাত্র দুইদিন?
-হ্যাঁ…আজকের দিন আর কালকের দিন । …আরকেটা কথা…শফিক সাহেবের উইলে দেখলাম উনি সম্পত্তি ৩ ভাগ না করে ২ ভাগ করেছেন…এক ভাগ দিয়েছেন রাব্বি আহমেদকে এবং বাকিটা রূম্পা আহমেদকে ।
-সিফাতকে কিছুই দেয় নাই?
-না…সম্ভবত সিফাতের উপড় কোন কারনে নাখোশ ছিলেন ।
-ও!…কিন্তু তাহলে সম্পত্তি পাবার লোভে খুনটা রাব্বি আহমেদও করতে পারে…!
-হ্যাঁ…তাতো পারেই…সেটা বের করার দায়িত্ব তো তোর…
-মামা, একটা কথা বলার ছিলো…
-শফিক রেহমানের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়েছ…?
-হ্যাঁ…কেন?
-ওটাতে মৃত্যুর টাইম কি লেখা আছে?১০.৩০ এর আশেপাশে?
-হ্যা…, কেন বলতো ।
-না…এমনিতেই । মামা আমার একটা কাজ করতে পারবে?
-কি?
-তোমাকে আমার পক্ষ থেকে রাব্বি আহমেদকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে ।
-কি ব্যাপারে…?
-এই আরকি শফিক সাহেবের মৃত্যুর সময় ও কোথায় ছিল?…অ্যালিবাই আছে নাকি?
-অ্যালিবাই মানে…?
-সাক্ষী…ওর উপস্থিত থাকার সাক্ষী ।
-ও…ঠিক আছে…করব ।
-আচ্ছা রাখি ।

এতটুকু নিশ্চিত হল যে তৎক্ষনাৎ বিষের প্রভাবেই মৃত্যু ঘটে শফিক সাহেবের । বাইরে থেকে কোন কিছু দেবার ফলে ধীরে ধীরে বিষাক্রান্ত হবার সুযোগ ছিলো না । মোবাইল রেখে দেয় তপু । ওকে রিনি প্রশ্ন করে ।

-ভাইয়া…বাবার ফোন ছিল?
-হ্যাঁ…চল ।
৭.
লন ঘুরতে ঘুরতে দারুন দারুন গাছপালা দেখছে তপু । অনেকটা বাগানের মতই । ও ভাবে, ”নিশ্চয়ই এটা রুম্পার কাজ । ”কারন এসব সম্পর্কে ওরই ভাল জ্ঞান আছে । আর একটু সামনে এগুতেই রুম্পাকে দেখতে পেলো । রূম্পা দাড়িয়ে আছে এবং আরেকটা লোক তার পাশে লনের মাটি সমান করছে । রূম্পা তাকে নির্দেশনা দিচ্ছে । দূর থেকে রুম্পাকে কয়েকবার ডাক দিলেও রূম্পা ফিরে তাকায় না । এটা বেশ অবাক লাগে তপুর কাছে । রিনিকে নিয়ে আরও কাছে যেতে থাকে । কাছে যেতেই কেমন একটা উৎকট গন্ধ তার নাকে বাড়ি দেয় । ডানহাত দিয়ে ও নাক চেপে ধরে এবং এগিয়ে যায় । কাছ থেকে রূম্পা আপু বলে ডাক দিলে চমকে উঠে রূম্পা আহমেদ । চমকানো ভাবটা বেশিক্ষন থাকতে দিলেন না তিনি । একটু এগিয়ে তপুর সাথে হ্যান্ডশেক করে । তপু লক্ষ্য করে রূম্পা আহমেদ  আর তার পাশে থাকা লোকটির মুখে দূষন মাস্ক । তপু কিছুটা অবাক হয় রুম্পাকে গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট পড়ে থাকতে দেখে । রুম্পার পাশের লোকটা একটা স্যান্ডো গেঞ্জি এর লুঙ্গি পড়া । তপু তার প্ল্যানমত প্রশ্ন করা শুরু  করে ও এর সাথে সাথে নোটপ্যাড আর কলম পকেট থেকে বের করে নেয় ।

-কি…আপু মনে হয় আমাকে দেখে একটু চমকে গেলেন?
-তাতো অবশ্যই…আমি কাজ করার সময় অন্যদিকে মন দিতে পারিনা…তাছাড়া আপনার তো এখন এখানে থাকার কথা না…কেস তো কালকেই সলভ হয়ে গিয়েছে ।
-না…আপু কেসে সমস্যা আছে…এই খুনের অভিযুক্ত খুনী রাব্বি ভাই নাও হতে পারে…কারন আমরা বিষে যে কম্পাউন্ড পেয়েছি তা কিন্তু রাব্বি ভাইয়ের কোম্পানীর ল্যাবে পাই নি ।
-ও…এখন আমাকে প্রশ্ন করবেন এইতো…?
-হ্যা…সবার আগে প্রশ্ন করছি…এই দুর্গন্ধ কিভাবে…?

রূম্পা আহমেদ তপুর কথায় হেসে ফেলে । পকেটে থাকা আরেকটি দূষন মাস্ক তপুর দিকে এগিয়ে দেয় । তপু সেটা মুখে লাগিয়ে নেয় ।

-আর বলবেন না…কয়েক মাস আগে ভার্সিটির বন্ধে বাড়িতে এসেছিলাম…তখন ঠিক করেছিলাম বাড়িতে নার্সারী করব । তাই প্রায় ৫০-৬০ টি চারাগাছ এনে ওখানে রাখি ।

ইশারায় বাড়ির পিছনের গুদামঘরের দিকে আংগুল নির্দেশ করল রূম্পা আহমেদ ।

-এছাড়া আরও কয়েক বস্তা সার আর কীটনাশক ও এনেছিলাম । কিন্তু তখন একটা ভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্টে আবার চলে যেতে হয় । এরপর যখন ভার্সিটি শেষ হয়ে গেলো তখন এসে দেখি বেশিরভাগ জিনিসই পঁচে গেছে । গুদামঘর থেকে ওগুলার গন্ধই আসছে । আজকে দেখি সাফ করব এগুলো ।

তপুকে কিছুটা সন্তুষ্ট মনে হল । বাকি প্রশ্নগুলো করতে শুরু করল ।

-আপনি খুনের সময় কোথায় ছিলেন?
-এক্সকিউজ মি…আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?
-দেখুন…এই প্রফেশনে সবাই সমান এছাড়াও যতটুকু শুনলাম শফিক সাহেব নাকি তার সম্পত্তি ২ ভাগে ভাগ করেছেন । আপনার আর রাব্বি ভাইয়ের মাঝে । তাই আপনার উপর সন্দেহ এসেই পড়ে…
-ঠিক আছে আমার কোন সমস্যা নাই…আমি ওই সময় একটা দোকানে ছিলাম । বাগানের জন্য সার কিনতে গিয়েছিলাম ।
-এখান থেকে কতটুকু দূরে ?
-বেশ ভালোই দুরে…দোকানের নাম “তুহিন স্টোর” । এখান থেকে ফেরার পথে সামনে পড়বে…দেখে নিতে পারেন ।
-কোন অ্যালিবাই আছে?
-হ্যাঁ, দোকানদারকেই জিজ্ঞাসা করে নিতে পারেন…আমার পরিচিত । মাঝে মাঝেই ওখানে বাগানের জন্য বিভিন্ন জিনিস কিনতে যাই ।

হঠাৎ রুম্পাকে ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে চোখ পড়ে তপুর । কিছুটা অবাক হয়ে যায় ও । একটা কাচ দিয়ে ঘেরাও দেয়া জায়গা দেখতে পায় । ও আরও অবাক হয় যখন দেখে ওটার ভিতর রিনি!সব কিছু বুঝতে পেরে যায় যখন ও রুম্পার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে ছিল তখনই রিনি ছাড়া পেয়ে গেছিল । ওখানে ঢুকে কি যেন করছে । ওকে দেখেই সেদিকে দৌড় দিল ও । কাচের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল । ওকে ভালোভাবে ধরে ওখান থেকে বের করে আনল । রিনিকে বের করে আনার সময় খেয়াল করল ওটার ভিতরের কিছু গাছ গোড়া থেকে কাটা । রিনিকে ওর সাথে এনে দাড় করিয়ে তপু ওই কাচ দিয়ে ঘেরা জায়গা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার আগেই রূম্পা আহমেদ মুখ খোলে । ততক্ষনে বিকট গন্ধের কারনে রিনির হাত নাকে ।

-ওই জায়গা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন এই তো?…তারচেয়ে আমিই বলে দিচ্ছি এটা……গ্রীন হাউস এফেক্ট সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানেন?
-হ্যা…কিছুটা…
-এটা তারই একটা মডেল বানিয়েছিলাম ।
-ওও!কিন্তু ভিতরে কয়েকটা গাছ কাটা দেখলাম ।
-আর বলবেন না আমার এক ফ্রেন্ড অস্ট্রেলিয়া থাকে ও আমার জন্য গোটা চারেক বিদেশী গাছ পাঠিয়ে ছিলো । কিন্তু সেগুলো এই দেশের আবহাওয়ায় খাপ খাচ্ছিল না । গাছগুলো মরে যাচ্ছিল । তাই কেটে ফেলেছি ।
-আচ্ছা । আপনার বন্ধুর নাম কি?
-রণন ।

এরমধ্যে তপু তার প্রয়োজনীয় তথ্য নোটপ্যাডে টুকে নিচ্ছে । রূম্পা আহমেদের কাছ থেকে আপাতত আর কিছু জানার নেই ।

-সিফাত ভাইকে কোথাও দেখলাম না?……
-ওর কথা আর বলবেন না । বাজে ছেলেদের সাথে মিশে গোল্লায় গেছে…আব্বা অনেক চেষ্টা করেছে ফেরাতে…কিন্তু পারেনি ।
-এখন কই উনি?
-বাইরে কোথাও গেছে হয়ত…ওর খবর আমরা কেউ তেমন একটা রাখি না ।

পাশে বসে থাকা লোকটির ব্যাপারে তপু জিজ্ঞাসা করলে রূম্পা বলে…

-ও…আমাদের বাগানের মালী ।
-এক কাজ করুন…আপনি আপনাদের বাসার সব কর্মচারীদের ডাকুন । ওদের প্রত্যেকের একটা সাক্ষাৎকার আগে নিয়ে ফেলি ।


এইমাত্র এই বাড়ির ৩ কর্মচারীর সাথে তপু সাক্ষাৎকার শেষ করল । এই ৩ জনের নাম ও পরিচয় তপু আরেকবার নোটপ্যাডে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো-
১.বাড়ির চাকর-আবদুল চাচা
২.বাড়ির মালী-মনোয়ার চাচা
৩.বাড়ির বাবুর্চি-রহমত মিয়া

আরেকজন কর্মচারীও ছিল । বাড়ির দারোয়ান । সে এই ঘটনার আগে থেকেই নাই । তার মা বাড়িতে অসুস্থ তাই সে ১ মাসের ছুটিতে বাড়ি গেছে । প্রথমে তপু দেখা করে আব্দুল চাচার সাথে । বাড়ির ভিতরে শফিক সাহেবের মরহুম স্ত্রীর রুমে উনাকে তপু খুজে পায় । ষাটোর্ধ একজন মানুষকে নিজের সামনে আবিষ্কার করে ও । টুপি, পায়জামা, পাঞ্জাবি পড়া একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ । কপাল ও গালের কুচকে থাকা চামড়া এবং সাদা দাড়ির মাঝে মানুষটিকে দেখে তপুর কেমন জানি অনুভুতি হয় । নিজের দাদাজানের কথা মনে পড়ে ওর । তপু রিনির দিকে তাকায়…

-তুই এখানে দাড়া…আমি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবি ।
-ঠিক আছে ভাইয়া ।

তপু আবদুল চাচার সামনে যায় ।

-স্লামালেকুম চাচা, …ভাল আছেন ।
-অ্যাঁ…কি বললা?
-বলছি…ভাল আছেন কিনা?
-কিইইই?

তপু বুঝল লোকটার কানে সমস্যা আছে । এ জাতীয় লোক নিজেই নিজের বোঝা…অন্যের সমস্যা কি করবে?তবু সে উচ্চগলায় প্রশ্ন করে…

-চাচা, ভালো আছেন ।
-হ…বাবা এই আরকি…
-আমি আপনার মালিকের ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছি ।

শফিক সাহেবের কথা শুনেই আবদুল চাচার মনটা খারাপ হয়ে গেলো ।
-বলো বাবা…কি কইবা কও…
-যেহেতু উনি মারা যাবার সময় আপনি বাসায় ছিলেন…তাই আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে ।
-এইডা কি কও বাবা?…আমি শফিকেরে ছোডবেলা থিকা মানুষ করছি…আর আমি মারমু শফিকেরে?

তপু বুঝতে পারে আবদুল চাচা এ বাড়িতে অনেক পুরোনো এবং শফিক সাহেবের খুব কাছের মানুষ । …তাই তাকে নাম ধরে ডাকছে ।

-না…চাচা আমি কি তা বলছি নাকি?…যখন শফিক সাহেবের খুন হল তখন আপনি কোথায় ছিলেন ।

বৃদ্ধ চাচা কিছুক্ষন ভেবে নেয় ।

-আমিতো বাবা এই রুমেই ছিলাম…রুমডা পরিষ্কার করবার লাগছিলাম…
-ও…আচ্ছা…আর একটা ব্যাপার । এই খুনের ব্যাপারে আপনার কাউকে সন্দেহ হয় ।
-নাতো…বাবা…কিন্তু…
-কিন্তু কি?
-আমি তখন এই রুমে ছিলাম…রহমতেরে শফিকের ঘরে ঢুকতে দেখছিলাম ।
-তখন কয়টা বাজে খেয়াল আছে…আপনার?
-না…বাবা সেডা তো সঠিক ভাবে বলবার পারুম না । তবে সাড়ে নয়টার উপরে বাজে ।

তপু দেখল চাচাজান আর কোন তথ্য দিতে পারবেনা । তাই আর কথা বাড়াল না ।

এরপর তপু দেখা করেছিলো রহমত মিয়ার সাথে । কিন্তু উনার সাথে কথা বলে তেমন  সুবিধা করতে পারল না ও । রান্নাঘরে রান্না করছিলো সে । তপুর আসার খবর আগেই পেয়েছে । তাই তপুকে দেখতেই রাগে গজগজ করে উঠল । সে কি তাকে দেখে রেগে গেল নাকি ব্যাবহারই এরকম সেটা তপু বুঝতে পারল না । রিনিকে তপু রহমত মিয়ার হেফাজতে রেখে এসেছে তাই সমস্যা হল না । চাচা হাতের চামচ দিয়ে পাতিলে কি যেন নাড়ছেন । লোকটার পরনে একটা লাল জামা এবং কাল প্যান্ট । মাথায় এত তেল দিয়েছেন যে মাথার চুল চপচপ করছে । চোখের নিচে ঘন করে সুরমা দেয়া । মুখে গুনগুন করে পুরোনো দিনের একটা হিন্দি গানের সুর ভাজছেন তিনি । তপু এগিয়ে যায়…

-স্লামালেকুম, চাচা কি করেন?
-ফাজিল পোলা…দেখতাছোনা কি করি…আবার জিগাও?
-সরি…চাচা…
-মুখে এইডা কি লাগায়া রাখছ?…ঢং দেখাও?

দূষন মাস্কের কথা মনে পড়ল তপুর । তাড়াতাড়ি মুখ থেকে ওটা নামিয়ে রাখল ।

-দেখো একবার কইয়া দিলাম …আমার সামনে ইংলিশ মারবা না…বুঝছো…
-জ্বী চাচা । …শুধু একটা কথা আবদুল চাচা বলল আপনি নাকি শফিক সাহেবের মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে শফিক সাহেবের রুমে গিয়েছিলেন?

সাপের মুখে যেন ওষুধ পড়ল… । চাচা থতমত খেয়ে গেলো ।

-ক্কি…কি…কইতাছ…আমারে বিলাকমেইল করবার চাও ।
-না…চাচা এগুলা কিছুই করার ইচ্ছা আমার । আপনি শুধু বলেন তখন আপনি কই ছিলেন?
-আমি আর করার কি আছে?আমি সাবের কাছে গেছিলাম সকালের বেরেকফাস্টে কি ওইব এইটা জিগাইতে?
-অ্যালিবাই আছে?
-কি…আলু্‌…
-না বলছি সাক্ষী…মানে কেউ দেখছে?
-কে দেখব…আমিতো গেছিই শফিক সাবের কাছে…উনি তো এখন নাই…থাকলে উনারে সাক্ষী বানাইতাম…

তপু বুঝল এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই । তাই বলল…

-সত্যি বলছেন তো?
-আ…মোর …জ্বালা…আমার মিথ্যা কয়া কি লাভ?

তপু দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ল । যত থাকবে ঝামেলা তত বাড়বে । রিনিকে নিয়ে বাড়ির বাগানে দেখা হল মনোয়ার চাচার সাথে । গায়ে গেঞ্জি, লুঙ্গি । মাথায় বাধা গামছা । কড়া রোদে বেশ ভালোই ঘামছেন তিনি । কোদাল দিয়ে কুপিয়ে মাটি সমান করছেন । মুখের উপর এক চিলতে গোফ আর বা গালে তিল চেহারাটাকে অনেকটা হাস্যকর বানিয়ে দিয়েছে । রিনি তো সামনা সামনি হি হি করে হাসা শুরু করল । মনোয়ার চাচা একটিবারের জন্য বিরক্তমুখে রিনির দিকে তাকাল । পরমূহুর্তে আবার কাজে মন দিল ।

-চাচা, আপনার সাথে একটা কথা ছিলো ।

কোদাল না থামিয়ে চাচা বলল…

-হু…কি বললা?
-বললাম…শফিক সাহেবের মৃত্যুর সময় আপনি কই ছিলেন?আমি এইহানেই ওই জমিটাতে সার দিতে আছিলাম । ইশারায় কাছেরই একটা জমি দেখায় সে ।

-কেউ দেখছে আপনাকে এই কাজ করতে?
-না…এত সকালে কেউ উঠছিলো না ।
-ঠিক আছে ।

যাইহোক এই ৩ জনের সাক্ষাৎকার তপুর বেশ ভালোই মনে আছে । যতটুকু ধারণা করছে আবদুল চাচা বাদে ওই দুজন কর্মচারী সরাসরি খুনে জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার সম্ভাবনা আছে । কারন ওদের খুনে সরাসরি জড়াবার মত কোন কারন পাচ্ছে না । বাড়ির গেটের কাছাকাছি চলে এসেছে ও আর রিনি এমন সময় হ্যাংলা পাতলা ছোটখাট গড়নের একটা ছেলে গেট দিয়ে প্রবেশ করল । ছেলেটা তপুর বয়সী বা তার চেয়ে কিছু বড় হবে । তপু হঠাৎ করে হায় সিফাত ভাই বলে হাত বাড়িয়ে দিল । ছেলেটাকে দেখে বোঝা গেল বেশ অবাক হয়েছে । অবশ্য হাত বাড়িয়ে তপুর সাথে হ্যান্ডশেক করে নিয়েছে । ছেলেটা বেশ দামী একটা হাতকাটা শার্ট পরা । নীল রঙের একটা প্যান্ট পড়েছে তার সাথে । গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ির সাথে কোটরাগত চোখ দেখলে যেকেউ সিফাতকে মাস্তান বলতে ভুল করবে না । তপু বলল…

-আমার যদি চিনতে ভুল না হয় তবে আপনিই সিফাত আহমেদ ।
-হ্যা..আমিই..
-আপনার সাথে আপনার বাবার মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু কথা…
-দেখুন আমি যদি কথা বলতে আগ্রহী না হই ।
-কথা তো আপনি ঠিকই বলবেন…আগে বলেন ড্রাগস নেয়া কবে থেকে চালু করেছেন ।

তপুর কথা ২২০ ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শক খেল যেন সিফাত আহমেদ । আমতা আমতা করতে শুরু করল । তপু আবার শুরু করে…

-হ্যাঁ…যা বলছিলাম…আপনার হাতাকাটা শার্টের কিছুটা নিচে ইঞ্জেকশনের দাগগুলো বেশ স্পষ্ট ।

সিফাত কোন কথা বলে না । ধরা পড়ে গেছে সে । তাই মাথা নিচু করে রাখে । তপু বলে…

-তো মিস্টার সিফাত…আহমেদ আমরা আলোচনা সামনের দিকে নিয়ে যাই… কি বলেন?

৮.

-ধ্যাত!আবার লোডশেডিং…

তপু রিনির হাত ভাল করে চেপে ধরে । মিনিট দশেক আগে শফিক আহমেদের বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে ওরা । সাড়ে সাতটা বাজে । তপুর সাথে শেষ পর্যন্ত কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলো সিফাত আহমেদ । লনের সামনের দিকেই একটা জায়গায় অনেক্ষন ওর সাথে কথা বলেছিলো । অনেক কথার মাঝে যে কথা গুলো গুরুত্বপূর্ন ছিলো সেগুলো হলো-

১.সিফাত ওইদিন রাতে অনেকক্ষন ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করেছিলো ।
২.চ্যাট শেষে সিফাত কিছুটা নেশা করেছিলো ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায় ।
৩.১ম দিন ওরা যখন শফিক সাহেবের তদন্ত করতে আসে তখন সিফাত বন্ধুদের ওখানে ছিল ।
৪.মাঝে মাঝে মাদকাসক্ত অবস্থায় সে ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করে…তখন তার কোন হুশ থাকে না ।

সিফাত তপুর সামনে ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলিয়ে কথার সত্যতা প্রমান করে । এছাড়া ওর ফেসবুকের চ্যাট হিস্টোরি ওকে দেখায় । আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল…যেটা তপুর পক্ষেই ধরে নেয়া যায় । তপু যখন সিফাতের সাথে কথায় ব্যাস্ত তখন রিনি দৌড়ে খানিকটা দূরে থাকা শফিক রেহমানের রুমের জানালার দিকে যায় । জানালাগুলোতে ছিল কাচের স্লাইডিং গ্লাস । রিনি বাইরে থেকে ঠেলা দিয়ে জানালা খুলে ফেলে!তপুর রিনির কথা মনে হতেই দেখতে পায় ব্যাপারটা । রিনিকে আনার জন্য জন্য জানালার কাছে গেলে কি দেখে যেন তপু থমকে দাঁড়ায় । ভাল করে জানালাটি পর্যবেক্ষন করে তপু । বুঝতে পারে এর লক নষ্ট ।

-যাক আরও একটা ক্লু তাহলে পেয়ে গেলাম আমরা…কি বলিস?
-মনে হয়…

শফিক সাহেবের বাসা থেকে মেইন রাস্তা বেশ কিছুটা দূরে । প্রায় রাস্তায় পৌঁছে গেছে ওরা । এর মাঝে ও আর রিনি রুম্পার এলিবাই অর্থাৎ “তুহিন স্টোরে” একটু ঢু মেরেছিল । রুম্পার কথাই সঠিক । অন্ধকারে হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে রিনিকে নিয়ে । হঠাৎ তপু যেন অন্ধকারে তাদের পিছনে কারো হেটে আসার শব্দ পেলো । তপু ঝটকা মেরে ঘুরে একবার পেছনটা দেখে নিল কিন্তু কিছু পেল না । রিনির হাতটা ভাল করে ধরে ও দ্রুত হাটা শুরু করল । এভাবে বেশী দূর যেতে পারল না তপু । মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাল ।


এইমাত্র জ্ঞান ফিরল তপুর । মাথার পেছন দিকটা এখনো হালকা ব্যাথা করছে । জ্ঞান ফেরার পর তপুর কিছুক্ষনের জন্য বুঝতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল যে সে কোথায় আছে । তবে মামার বাড়ির পরিচিত দৃশ্যপট দেখে খানিকক্ষন পড়েই ওর সব মনে পড়ল । তপুর মাথাটা ব্যান্ডেজ দিয়ে বাধা । ও বিছানায় উঠে বসল । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সকাল ১০ টা বাজে । এমন সময় মামা রুমে ঢুকল ।

-কিরে তপু…উঠে গেছিস…নে তাড়াতাড়ি আবার শুয়ে পড়…ডাক্তার তোকে বিশ্রাম করতে বলে গেছেন ।
-এখানে কিভাবে…?
-বলছি…তোকে কে যেন মাথায় আঘাত করেই দৌড় দিয়েছিল । রিনি অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পায়নি । তুই তখন অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলি আর রিনি পাশে বসে কান্না করছিল । আমি তোর আসার দেরী দেখে গাড়ি নিয়ে শফিক সাহেবের এদিকে আসতে গিয়েই তোকে আর রিনিকে রাস্তায় পাই…
-না…মামা আজকে না তদন্তের শেষ দিন?
-আরেহ…বাদ দে এসব…তোর জীবনের ঝুকি থাকবে জানলে কি এর এসব গোয়েন্দাগিরি করতে বলতাম?
-মানে????
-মানে আর কি…তোর আর গোয়েন্দাগিরি আর করা লাগবে না…ডাক্তার বলেছে আরেকটু হলেই মাথাটা যেত…
-কিন্তু…?
-কোন কিন্তু না…আমি যা বলছি তাই হবে…শুয়ে থাক আর কোন কথা না । আমি অফিসে যাচ্ছি…ফিরে এসে তোকে যেন শোয়া অবস্থায় দেখি ।
-মামা, শুধু একটা কথা ছিল?
-কি?
-রাব্বি আহমেদ তোমাকে কি বলছে?
-বলছে ওই ঘটনার দিন সে অফিসে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে । ফলে পরের দিন সকালে দেরী করে উঠেছিল । আমি ওর কলিগের কথা বলে জানলাম ব্যাপারটা আসলেই সত্যি । আরও একটা ব্যাপার জেনেছি যে কয়েকদিন ধরেই নাকি রাব্বি শফিক সাহেবের কাছ থেকে কিছু টাকা চাচ্ছিল ব্যাবসার কাজে ।

তপু আর কোন কথা বাড়ায় না । মনটাই ভেঙে যায় ওর । মামা অফিসে চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষন বসে থাকে…এর মধ্যে মামী এসে ওর বিছানায় খাবার দিয়ে যায় । খাওয়া শেষে ও চিন্তায় পড়ে যায় । নাহ কাউকেই খুনী হিসেবে প্রমান করা যাচ্ছে না । যে দুজন খুন করার মোটিভ আছে তাদের সবারই অ্যালিবাই আছে । আর কর্মচারীদের কারোরই কোন অ্যালিবাই নাই । বড়ই অদ্ভুত!দু’জন বলার কারন আছে । আপাতত রুম্পাকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাহিরে রেখেছে । অন্য দুজনের অ্যালিবাই বানানো হতে পারে কিন্তু রুম্পার ক্ষেত্রে তা হবে না । এছাড়া রুম্পার খুনের পেছনে কোন মোটিভ খুজে পাচ্ছে না ও । রাব্বির খুন করার পিছনে সবচেয়ে বড় মোটিভ হল সম্পত্তি । আর সিফাত নেশাগ্রস্ত অবস্থায়ও খুন করতে পারে । কিছুই মাথায় আসছে না তার । তপু উঠে মামাদের বাড়ির বারান্দায় যায় । বারান্দার গ্রিল ধরে ও দাড়িয়ে থাকে । এমন তো হবার কথা ছিলো না । জীবনের ১ম কেসের পরিনতি দেখে খুব কান্না পায় তপুর । নিঃশব্দে ভিজে যায় ওর দুটো গাল । তপু এতটাই মগ্ন ছিলো যে কখন রিনি বারান্দায় এসেছে টেরই পায়নি । রিনির হাতে একটা বল ধরা । সেটা কয়েকবার নিজের হাতে লুফে নিয়েই তপুকে প্রশ্ন করে…

-ভাইয়া…ক্যাচ ক্যাচ খেলবে ।

তপু চমকে যায় । রিনি যাতে না দেখতে পায় এভাবে চোখের পানি মুছে ফেলার চেষ্টা করে ।

-ওহ…রিনি…বারান্দায় কখন আসলি?
-এইমাত্র আসলাম…ক্যাচ খেলবে?

রিনি ওর দিকে বলটা বাড়িয়ে দেয় । তপু না বলে মুখ আরেকদিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল কিন্তু বলটা দেখে থমকে গেল । রিনির কাছে থেকে বলটা নিল । ঠিক বল বলা যাবে না এটাকে । দেখতে অনেকটা গোল, আকৃতি আপেলের মত হলেও সাইজে ছোট, রং হলুদাভ সবুজ । তপু বুঝতে পারে অনেকদিন আগে ফল গাছ থেকে ছিড়া হলে তার রস শুকিয়ে ছোট হয়ে যায় এবং রঙও ধূসর হয়ে যায় । সেটা না হয় ঠিক আছে কিন্তু এরকম ফল ও এর আগে দেখেনি । রিনিকে জিজ্ঞাসা করে-

-রিনি…এদিকে তাকা…
-বল…ভাইয়া
-এই ফলটা কোথায় পেয়েছিস?
-এটা ফল না বল…

তপু জানে এটা ঝগড়ার সময় না ।

-আচ্ছা ঠিক আছে এটা বল…কোথায় পেয়েছিস?
-এটা কোথায় যেন পেলাম…উ…মনে পড়েছে…
-কোথায়…তাড়াতাড়ি বল ।
-ওই যে একটা কাচের বাক্স দেখলাম না ওটার ভিতরে…

তপু বুঝতে পারল রিনি গ্রীন হাউজ এফেক্টের মডেলের কথা বলছে । ফলটা নিয়ে কেমন জানি সন্দেহ হল তার । তপুর মনে পড়ে গেল মামার রুমে তার ল্যাপটপটা থাকতে পারে । মামার রুমে ল্যাপটপ দেখে যেন ঝাপিয়ে পড়ল ওটার উপর । মডেম লাগিয়ে গুগল চালু করল । সেখানে এই ফলটির বৈশিষ্ট্য দিয়ে সার্চ করতে থাকলো । কিন্তু তপুকে হতাশ করল গুগল । আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে । শেষবারের মত “দেখতে আপেলের মত” এই বৈশিষ্ট্য  যোগ করে সার্চ দিয়ে যে সার্চ রেজাল্ট পেলো এটা সে আশা করে নি । নিজের রুমে গিয়ে নোটপ্যাড নিয়ে এসে ল্যাপটপের স্ক্রীন থেকে কিসব তথ্য টুকে নিল । ল্যাপটপে আরও কিছু তথ্য সার্চ করল । একটা দারুন সূত্র পেয়েছে কিন্তু মিলাতে পারছেনা । কিছু একটা মিস করছে সে । কালকের মাথায় আঘাত পাওয়ার সময় সে কি কিছু অনুভব করেছিলো?হ্যাঁ কিছু একটা ধরতে পারল । মাথায় বাড়ি কে দিয়েছে সেটা ধরতে পেরেছে । আর অনেক কিছু মেলাতে কষ্ট হচ্ছে । গভীর চিন্তামগ্ন তপুর ধ্যান ভাঙল অনেক পরে… রিনির ডাকে ।

-ভাইয়া…কিছু চিন্তা করছ?
-হ্যারে…রিনি…হিসাব মিলছে না ।
-ভাল করে চিন্তা কর…হয়তো এমন কিছু মিস করছ যেটা তোমার সামনেই ঘটেছে কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না…
-দেখি……

নোটপ্যাড খুলে গত ২ দিনের ঘটনা পুংখানুপুংখ ভাবে বিশ্লেষন করতে গিয়ে অবাকই হল সে । এমন একটা ঘটনা ঘটেছে অথচ সে সেটা খেয়ালই করেনি । শফিক সাহেবের ডায়রীতে পাওয়া “আয়না” শব্দটির অর্থও এখন পরিষ্কার ওর কাছে । “কি বুদ্ধিমান ছিলেন শফিক রেহমান”, ভাবে তপু । কেসটা সম্পুর্ন তপুর ধারনার বাইরে চলে গেছে । হাতে সময় বেশী নেই । একটা সম্ভাবনাই বাকি আছে । এখন শুধু সিউর হতে হবে । দ্রুত মামার নাম্বারে ডায়াল করে তপু । দুবার কল বাজার পড়েই মামা কল রিসিভ করে ।

-হ্যালো…কিরে কি জন্য কল করেছিস?
-মামা…তোমার সাথে কিছু গুরুত্বপুর্ন কথা ছিলো ।

৯.

শফিক সাহেবের রিডিং রুমে হাজির হয়েছে সবাই । রাব্বি আহমেদ ছাড়া সবাই উপস্থিত । সিফাত, রহমত মিয়া সহ কয়েকজনকে বেশ বিরক্ত মনে হল । শফিক সাহেবের বিছানায় সিফাত আর রূম্পা আহমেদ বসে আছে, বাকি কর্মচারীরা দাড়িয়ে । ওদের সামনে শফিক সাহেবের রিডিং টেবিলের পাশে তপু দাড়িয়ে আছে । মামার কাছ থেকে বেশ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ন তথ্য পেয়েছে যেগুলো কেসটা সলভে ভালো ভূমিকা রেখেছে । হাতঘড়ি দেখল ও । ১.২৬ বেজে আছে সেখানে । তপু একটু নাটকীয় ভাবে শুরু করল ।

-সবাইকে এই বেখাপ্পা টাইমে ডাকার জন্য দুঃখিত । আসলে কেসটাই এত বেরসিক ছিলো যে…

“আমাগো অখন ক্যান ডাকছ সেইটা তাড়াতাড়ি বল…আমাগো অন্য কাম আছে”, তপুর কোথায় বাধা দিল রহমত মিয়া । তার কথায় পাত্তা দেয় না তপু । শফিক সাহেবের রিডিং টেবিলের চেয়ারটা টেনে তাতে বসে পড়ে ।

-আসলে একটা মজার ব্যাপার হয়েছে…দেখুন কেসটা যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছে ঠিক সেই জায়গায় এসেই শেষ হল । আসলে আমি খুনীর মোটিভ ধরতে পারিনি তাই……নয়তো এই কেস কালকেই সলভ হয়ে যেত । তপুর কথায় বাধা এবার বাধা দেয় রূম্পা আহমেদ ।

-তপু…আমার একটা প্রশ্ন ছিলো ।
-বলেন…?
-তুমি এই অসুস্থ শরীর নিয়ে একলা এখানে আসার কি দরকার ছিলো…তুমি জানালে আমরাই নয়তো তোমার এখানে যেতাম ।
-সেটার দরকার নাই…এরকম করলে খুনী ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো ।

তপু আবার সবার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে…
-কে এই ঘটনার হোতা সেটা বলার আগে আপনাদের একটা গল্প বলি…এক ধনী ব্যাক্তির গল্প । যেই ধনী ব্যাক্তির একজন ছেলে ছিলো । ছেলেটা ছিলো মেধাবী কিন্তু উচ্ছৃংখল প্রকৃতির । সব সময় স্কুলে ভালো রেজাল্ট করত । বাবার অনেক টাকা থাকায় তাকে কখনো টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করতে হয় নি । এক পর্যায়ে সে শহরের ভালো কলেজে ভর্তি হল । সেখানে এক মেয়ের সাথে তার প্রেম হলো । তাদের মধ্যে প্রেম একসময় গভীর হয়ে গেলো । কিন্তু কথায় আছে না, ”চোরের দশদিন গৃহস্তের এক দিন” । সেটাই ঘটল অর্থাৎ ছেলের পরিবারের সবাই ব্যাপারটি জেনে গেল । ছেলেটা পরিবারের সবচেয়ে আদরের সন্তান ছিলো আর তাই জানাজানি হলেও ছেলের পরিবার ওই মেয়েটির সাথে ছেলেটির বিয়ে দিয়ে দেয় । মেয়েটির পরিবারেরও সবাই খুশি ছিল শুধুমাত্র মেয়েটির বাবা ছাড়া । এ ঘটনায় খুব কষ্ট পায় সে । …তো যাই হোক মেয়েটির সংসার ভালোভাবেই শুরু করেছিল এবং ছেলেটিও তার বাবার ব্যাবসা বুঝে নিয়েছিল । কিন্তু এই সুখ তাদের কপালে বেশিদিন ছিলো না । ছেলেটা তারই ব্যাবসার সাথে যুক্ত আরেকটি মহিলাকে পছন্দ করে ফেলল । এক সময় এ কথা জানাজানি হয়ে যায় পরিবারে । তখন সংসারে অশান্তি নেমে আসে । এই অশান্তি এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় যে ছেলেটি মেয়েটিকে তালাক দেয় । ও…হ্যা এর মাঝখানে ওরা ৪ বছর সংসার করেছিলো । এর মাঝে ওদের দুটো ফুটফুটে জমজ বাচ্চা হয়েছিল । এ দুটি বাচ্চার মধ্যে শফিক সাহেবের একটি  বাচ্চা খুব প্রিয় ছিলো । তাই ডিভোর্সের সময় শফিক সাহেব একটি বাচ্চা তার কাছে রেখে দেয় । আরেকটি বাচ্চাসহ মাকে দেন মোহরানা ছাড়াও ১ লাখ টাকা বেশী দেয়া হয় এই শর্তে যে কোনদিন তারা ছেলেটির সামনে এসে দাঁড়াবে না । রাজি না হয়ে কোন উপায় থাকে না মেয়েটির । এদিকে মেয়েটি সেই বাচ্চাটিকে নিয়ে কোথায় চলে গেলো তার খবর কেউ রাখল না ।  । বাবার অমতে বিয়ে করার কারনে বাবা ওকে ঘৃনা করত । তাই মেয়েটি কিন্তু তার বাবার কাছে ফিরে যায়নি । এদিকে ছেলেটি আবার বিয়ে করে তার পছন্দের সেই মেয়েটিকে । এখানে তার দুটো ছেলে হয় ।

এতটুকু বলার পর যেন হাফ ছেড়ে দম নিল তপু । আবার বলতে শুরু করল-

-আপনাদের কাছে নিশ্চয়ই অবাক লাগছে এই ভেবে যে গল্পটা কেন শোনালাম?…আমি গল্পের চরিত্র গুলোর নাম বলে দিলেই আপনাদের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে । ছেলে চরিত্রটি শফিক রেহমান । এবং তার দুটি যমজ মেয়ে হল টুম্পা এবং রুম্পা । আশা করি এখন আপনারা বাকি চরিত্রগুলো ধরতে পেরেছেন ।

আবদুল চাচা যে কাদছেন তা এখান থেকেই স্পষ্ট বুঝা গেলো । সিফাত বিড়বিড় করে বলল, ”এ ঘটনা আমি আগেই আবদুল চাচার কাছ থেকে শুনেছি । রুম্পার চোখে দেখা যাচ্ছে অবিশ্বাসের প্রশ্ন । পানি টলটল করছে ওর চোখে ।

-আমি…বিশ্বাস করি না…সিফাত, তুই তো আমাকে কোনদিন বলিস নি ।

তপু রূম্পা আহমেদকে পাল্টা জবাব দেয় ।

-এটাই সত্যি……আর সত্যি কথা বলতে আরও অবাক হওয়ার ব্যাপার আছে । …কালকে আমি যখন মাথায় আঘাত পাই তার আগে আমি একটা গন্ধ পেয়েছিলাম…সোদা মাটির গন্ধ…

এটা বলে তপু মালীর দিকে তাকায় । যা বোঝার বুঝে গেছে মালী ওরফে রহমত মিয়া । পালানোর চেষ্টায় রুমের দরজার দিকে দৌড় দেয় । কিন্তু মনোয়ার চাচা তার উদ্দেশ্য আগে থেকেই বুঝতে পেরে পেছন থেকে জাপটে ধরে । রহমত মিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে । রুমে পড়ে থাকা একটি দড়ি দিয়ে ওকে কষে বাধলেন মনোয়ার ও আবদুল চাচা । রহমত মিয়া তখন ফুপিয়ে কাঁদছেন । তপু বলল…

-এরপর আমি একটু চিন্তায় পড়ে যাই…যে…একজন মালীর তো এসব করে কোন লাভ হবে না…নিশ্চয়ই এর পেছনে কেউ আছে । এই জায়গায় এসে আমি আটকে গিয়েছিলাম কিন্তু এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করল আমার মামাত বোন রিনি ।

রুম্পা আহমেদের দিকে উদ্দেশ্য করে তপু বলল, ”দেখুন তো এই ফলটা আপনার বাগানের কিনা.?..রিনি বলল এটা আপনার কাচের ঘের দেয়া অংশে পেয়েছে” । তপুর হাত থেকে হাত বাড়িয়ে ফলটা নিল রূম্পা আহমেদ । ভালো করে দেখে নিয়ে রূম্পা ফলটা ফেরত দিতে যাচ্ছিল এমন সময় তপু একটু গম্ভীরভাবে বলে উঠল-

-ফলটা আর ফেরত দেবার দরকার নেই মিস টুম্পা আহমেদ……আপনি ধরা পড়ে গেছেন ।

তার এ কথায় যেন পুরো রুম ২-৩ সেকেন্ডের জন্য স্থবির হয়ে যায় । সিফাত ১ম বলে ওঠে…

-ক্কি…কি বললেন?…মিস টুম্পা!!!
-হ্যা…সিফাত আমি যা বলছি সেটাই সত্যি এ তোমার বোন রূম্পা নয় তোমার সৎ বোন টুম্পা ।
-এটা কিভাবে…সম্ভব?
-বলছি  বলছি…আর আমার উপরে অভাবে রেগে থাকবেন না মিস টুম্পা ।

মিস টুম্পার চেহারা তখন দেখার মত হয়েছে তপুর দিকে অগিদৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন বলছেন…

-এসব উলটাপালটা কি বলতেছ?যা খুশি তাই…?কোন প্রমান আছে…?

তপু এবার বলতে শুরু করে…

-যা বলছিলাম…আমি ফলটা রিনির কাছ থেকে পাই । দেখেই বুঝতে পারলাম ফলটা শুকিয়ে গেছে অর্থাৎ অনেকদিন আগের । তবু ফলটার বৈশিষ্ট নিয়ে গুগলে সার্চ দিতেই পেলাম এক অদ্ভুত তথ্য । ফলটার আসল নাম হল “Mancinella” । তবে এর ডাকনাম অনেক সুন্দর । একে “Beach Apple” বলে ডাকা হয় । নাম যতই সুন্দর হোক এর কাজ তেমন সুন্দর না । এই ফলগুলো এতটাই বিষাক্ত যে ৭-৮ ফুট দূরে থেকে এর ঘ্রান নিলে সে অজ্ঞান অথবা মারা যায় । যা বোঝার বুঝে নিলাম আমি যে এই ফল দিয়েই মারা হয়েছে শফিক সাহেবকে ।

সিফাত বলে ওঠে…

-কিন্তু আপনি যে ফলটা হাতে নিলেন…আপনার কিছু হল নাহ?
-হ্যা…গুড কোয়েশ্চেন । একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে ফলটার ভিতরে যেই রস থাকে সেটাই মূলত বিষাক্ততার কারন । কিন্তু আমার হাতে যেটা ছিল সেটা প্রায় শুকনো ছিল…তাই কোন ক্ষতি হয়নি । এই একই ঘটনা ঘটেছিলো ফরেনসিক ল্যাবের ক্ষেত্রে । পরের দিন ফলের রস পচে যাওয়ায় কিংবা শুকিয়ে যাওয়ায় কোন কম্পাউন্ডই পাওয়া যায় নি । তবে মামা আমাকে বলেছিলেন ফরেনসিক ল্যাব নাকি এই ধরনের আগে কম্পাউন্ড পায় নি । তাই আমি গাছটার উৎপত্তিস্থল নিয়ে সার্চ দিতেই পেলাম আরেক মজার তথ্য । এটা আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়ারই কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায় । যেহেতু এটা বাংলাদেশে পাওয়াই যায় না তাহলে এর কম্পাউন্ড অপরিচিত হওয়া অদ্ভুত কিছু নয় ।
-এরপর কি দেখলেন?
-হ্যা…এরপর অগ্রসর হওয়া আমার জন্য একটু কঠিন ছিলো । আসলে শফিক সাহেব সবই জানতেন পরে বুঝতে পারলাম । শফিক সাহেবের ডায়রীতে লেখা ছিলো “আয়না” । আয়না মানে হতে পারে প্রতিবিম্ব । কিন্তু কিসের প্রতিবিম্ব???বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল বেশ । তবে রিনির কথামত গত ২ দিনের ঘটনা বিশ্লেষন করতে গিয়ে একটা সুক্ষ্ম জিনিস পেলাম যেটা অন্যরকম…সেটা হল রুম্পা বামহাতি । ১ম এবং ২য় দিন হ্যান্ডশেক করার সময় ও বাম হাত দিয়ে হ্যান্ডশেক করেছিলো এমনকি আমি সিউর হওয়ার জন্য আজকে যখন ওকে ফলটা দিলাম তখনও কিন্তু ও সেটা বাম হাত দিয়ে নিয়েছে…আপনারা সবাই সেটা লক্ষ্য করেছেন ।

আবদুল ও মনোয়ার চাচা শুধু সম্মোহিতের মত ওদের কথা শুনে যাচ্ছে । বলার মত ভাষা নেই ওদের কাছে । সিফাত জবাব দেয়…

-হ্যাঁ…রূম্পা আপু তো যতদূর মনে হয় বামহাতি ছিলেন না ।

টুম্পাকে দেখে এখন আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না । এই মুহূর্তে উনি মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন । তপু শুরু করে…

-আমার আরেকটু সন্দেহ হলো…রুম্পা যদি বামহাতি হয় তবে শফিক সাহেবকে কেন “আয়না” লিখতে হবে…আর রূম্পা কার প্রতিবিম্ব?নোটপ্যাডে চোখ বুলাতেই মনে পরে গেল যে রূম্পা আর টুম্পা জমজ ছিল । ”আয়না” শব্দটার একটা ভাল সম্ভাবনার কথা মনে পড়ল । ইংরেজিতে বলা হয় “Mirror Twins” । যার বাংলা করলে দাঁড়ায় “আয়না জমজ” । শব্দটা শুনতে যদিও হাস্যকর তবু অনেক অর্থপুর্ন… । কিছু বুঝলেন?

সিফাতের মাথা নাড়া দেখে তপু বুঝতে পারল “Mirror Twins”এর মানে সে বুঝে নি । ব্যাখা করল সে…

-ধরুন আপনি যদি একটা আয়নার সামনে দাড়ান…তখন কি ঘটে ?আপনি আপনার একটা প্রতিবিম্ব পান । সেরকম মেডিকাল সাইন্সে “Mirror Twins”হল দুটো বাচ্চা যদি একটি আরেকটির প্রতিবিম্বের মত তৈরী হয় । অর্থাৎ একটি  বাচ্চা ডানহাতি হলে অন্যটা বামহাতি হবে…বুঝেছেন?
-হ্যা, তারমানে রূম্পা আর টুম্পা “Mirror Twins” ছিলো?
-হু…কিন্তু আমি সিউর হওয়ার জন্য মামাকে রূম্পা আর টুম্পা ফরিদপুরের যে হসপিটালে হয়েছিল সেখানে খোজ নিতে বলি । আরও বলি রাব্বি ভাইকে একটা প্রশ্ন করতে, ”রূম্পা আপু কি বামহাতি?”

সিফাত বলল, ”তারপর?”তপু  উত্তর দেয়…

-তারপর আর কি হবে?যা ধারনা  করেছিলাম সেটাই প্রমানিত হল । এই ধারনা আরও পোক্ত করল ২য় দিন আপনাদের বাসায় আসার পর টুম্পাকে দূরে থেকে কয়েকবার রূম্পা বলে ডাক দিয়েছিলাম কিন্তু উনি বুঝতে পারে নি যে আমি উনাকেই ডাকছিলাম । পরে কাছে
গেলে উনি বলে  কাজে মগ্ন ছিলেন তাই শুনতে পান নাই । আমি দুনিয়াতে এমন কোন মানুষ দেখি নাই যে কিনা নিজের নাম শুনে ফিরে তাকায় না । যদিও ওই মুহুর্তে টুম্পাকে সন্দেহ করার মত কোন কারন ছিল না । শুধুমাত্র কিছু সূত্র জোড়া লাগানো বাকি ছিলো । আমার যতটুকু মনে হয় টুম্পা ছোটবেলা থেকে অনেক সংগ্রাম করেছে । এই সংগ্রামের পথে তার বন্ধু থাকার সম্ভাবনা বিরল । কোন বন্ধু এই গাছ এনে দেয়ার গপ্পো বিশ্বাস হলো না । তাছড়া এই গাছ সম্পর্কে কেউ অভিজ্ঞ না হলে তার মৃত্যু অনিবার্য ছিলো । তাই এরপর আর একটা কাজ বাকি ছিল যেহেতু  জেনেছি “Mancinella”গাছ ইন্ডিয়াতে পাওয়া যায় । আমি এই গাছ নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ করে তাদের নাম গুগল থেকে বের করলাম । ওদের এখানে অধ্যয়ন কিংবা কর্মরত লোকের লিস্ট বড় হলেও । দেশ এর ঘরে বাংলাদেশ সিলেক্ট করে দিতেই সংখ্যাটা অনেক কমে গেলো । সেখান থেকে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে অধ্যয়নরত টুম্পার নাম খুজে নিতে কষ্ট হয় নি মোটেও ।

সিফাত প্রশ্ন করে…

-কিন্তু, রূম্পা না না টুম্পা সারের জন্য দোকানে গিয়েছিল ।

তপু জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে এবং বলে…

-এখানে আরেকটা চাল চেলেছে টুম্পা… । এক্ষেত্রে তার কাজে সাহায্য করেছে রহমত । নিশ্চয়ই ওকে মোটা টাকার লোভ দেখানো হয়েছে…তাই না রহমত । রহমত এ কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে । সিফাত তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে কালকে রিনি লক নষ্ট স্লাইডিং জানালা খুজে পায়?আমি সেই স্লাইডারটির হাতলে কিছু শুকনা মাটি লেগে থাকতে দেখেছিলাম কিন্তু তখন আমলে নেই নি । পরে ভাবতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেলো । টুম্পা হয়ত ফলের রস কোন ড্রপার বা এই জাতিয় কিছুতে রেখেছিলো । টুম্পা বেড়িয়ে যেতেই রহমতকে সব নির্দেশনা দেয়া ছিলো । সে সুন্দরভাবে মাঠের কাজ রেখে শফিক রেহমানের ঘরের বাহিরের দিকে যায় । তখন সেখানে শফিক সাহেব বেঘোরে ঘুমুচ্ছেন । কাছের স্লাইডারটির সরিয়ে রেখে রিডিং টেবিলে খোলা পড়ে থাকা দোয়াতের কালিতে রসটা মিশিয়ে দেয় । ভাগ্যক্রমে সেদিন শফিক সাহেব দোয়াতের মুখ খোলা রেখেছিলেন । নয়তো মালীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট আমরা দোয়াতেই পেতে পারতাম । চমৎকার প্ল্যান সাজিয়েছিলেন মিস টুম্পা । রুম্পার জায়গা দখল করে বসলেন । তারপর নিজের বাবাকে মেরে দোষ চাপালেন ভাইয়ের ঘাড়ে । যেহেতু টুম্পা আর রাব্বি আহমেদ সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী তাই সব কিছু শুধু তিনি ভোগ করতেন । এক ঢিলে ৪ পাখি মেরেছেন!আর সেই গাছগুলোকে কাচের ঘরে এমনভাবে বড় করা হয়েছে যেন বিষাক্ত গ্যাস বাহিরে না যায় । তবে আমি টুম্পাকে একজনের খুনে অভিযুক্ত করব না…রুম্পার খুনও ওই করেছে এবং লাশ লুকিয়ে রেখেছিলো সেই গুদামঘরে যেখান থেকে উৎকট গন্ধ আসছিলো ।  । আমার আসলে উচিত ছিলো সেদিনই গুদামঘর……

তপু কথাগুলো বলতে বলতে চেয়ার থেকে দাড়িয়ে সিফাতের দিকে ফিরে স্তব্ধ হয়ে যায় । সিফাত এতক্ষন কেন কোন কথা বলছিলো না তার কারন স্পষ্ট হয় । টুম্পা সিফাতের গলায় একটি পিস্তল ঠেকিয়ে রেখেছে । আবদুল চাচা ও মনোয়ার চাচা ভয়ে কাপছেন । টুম্পা তপুকে হিস হিস করে বলল…

-অনেক বেশী জেনে ফেলেছিস…তুই…যেগুলো তোর জানার অধিকার ছিলো না…

তপু টুম্পাকে শান্ত করার চেষ্টা করে ।

-দেখুন এভাবে করলে তো হবে না…আপনি শুধু শুধু নিজের ঝামেলা বাড়াচ্ছেন । এক কাজ করুন আপনি পুলিশের কাছে সব দোষ স্বীকার করুন…আপনার শাস্তি কমানোর ব্যাবস্থা করা হবে ।

টুম্পা সিফাতকে নিয়ে টেনেহেঁচড়ে শফিক সাহেবের রুমের দরজার সামনে এসে দাড়াল । দরজার দিকে পিঠ দিয়ে তপুর মুখোমুখি হল ।

-কোন শাস্তির কথা বলছ তপু…যার জন্য আমাকে পিতৃ পরিচয়বিহীন জীবন কাটাতে হল । ধুকে ধুকে অনাহারে প্রতি মুহুর্ত কাটিয়েছি । মা আমার রোগের কারনে চিকিৎসার অভাবে মারা গেল । বহু কষ্টে পার্ট টাইম জব করে এবং মায়ের শেষ গহনাগাটি সব বিক্রি করে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে গেছি । ..জীবন এত সোজা না তপু…
-না…আসলে সেটা না…

তপু আসলে টুম্পাকে ব্যাস্ত রাখতে চাইছে । তার মামা এত পাগল না যে গতকালের ঘটা ঘটনার পরেও তপুকে একলা ছেড়ে দেবেন । তপুর মামাই তপুকে এখানে এনে পৌঁছে দেয় । এ বাসায় ঢুকার পর থেকেই তপুর মোবাইলে কল চালু করা ছিলো । তপু এবং বাকিরা যা যা বলছে সবই হয়তো শুনেছে তপুর মামা । কোন বিপদ দেখলে তপুর কোড ছিলো “দেখুন এভাবে করলে তো হবে না” । তপু সেটা বলে দিয়েছে । এখন শুধু দেখার পালা…কাজ হয় কিনা…?টুম্পা তপুকে বলে…

-কি সেটা…বল..হারামজাদা..?
-আমি বলছি ভুল করেছে শফিক রেহমান তাকে আপনি মারতে পারেন কিন্তু রূম্পা কি দোষ করল?..ওতো আপনার আপন বোন ছিলো…?
-হাহ…আপন বোন । ও যদি আমার আপন বোনই হত তবে আমার একবার খোঁজ নিত…নিয়েছে কি?নেয় নাই…
-আপনি কি ভাবছেন এই খুনটা করে আপনি বেঁচে যাবেন…?
-সেটাতো জানি না তপু…তবে মানসিকভাবে শান্তি পাব অনেকদিন পরে আমার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ হিসেবে ।

তপু মামাকে দূর থেকে দেখতে পেল । মামা ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে । সে কথা চালিয়ে গেলো ।

-আপনি একজন ম্যানিয়াক…বুঝেছেন?
-ম্যানিয়াক হই আর যাই…

এর বেশী শব্দ টুম্পার মুখ দিয়ে বেরোনোর সুযোগ পেলো না । শিহাব সাহেবের পিস্তলের বাটের আঘাতে মেঝেতে ঢলে পড়লেন ।

১০.

তপু হাতঘড়ি দেখল । বিকাল ৫.৩৯ বাজে । এই মুহুর্তে ও মামার পুলিশ স্টেশনে । তবে ও একলা নয়…ওর সাথে রাব্বি আর সিফাত আহমেদ ও আছে । ”ধ্যাত, এভাবে আর কতক্ষন?”, তপু ভাবনায় মগ্ন । সেই কখন থেকে মামার ডেস্কে বসে আছে ওরা তিনজন । মামা ওদের সামনে নেই । তপু হাত দিয়ে টেবিলে তুড়ি বাজাচ্ছে । কিছুক্ষন পর রাব্বি আহমেদ তপুকে বলে…

-আসলে তপু কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছিনা । তুমি না থাকলে হয়তো আজ আমি ওই সেলের ভিতর মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনতাম ।
-না…না…ইটস ওকে…
-যাই হোক আমি তোমাকে এই কেস সলভের জন্য কিছু সম্মানী দিতে চাই ।

তপু দেখল রাব্বি আহমেদ তার জামার পকেট থেকে একটা খাম বের করে । সে নিতে চায় না কিন্তু রাব্বি আহমেদ জোর করে তার পকেটে খামটা ঢুকিয়ে দেয় । সিফাতও বলে উঠে…

-দেখো…তপু, বড় ভাই কিছু দিলে সেটা কিন্তু নিতে হয়…আর আমরা এখন থেকে তোমাকে তুমি বলে ডাকব ।

তপু কোন কথা বলে না । এমন সময় তার মামা নিজের ডেস্কে এসে ধপ করে বসে পড়েন । তপু জিজ্ঞাসা করে…

-মামা…টুম্পার স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে?
-হু…হয়েছে ।
-রুম্পার খুনটা কিভাবে ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে কি বলল?
-হ্যাঁ…বলল ওর মা বেঁচে থাকতে ওকে শফিক রেহমান কোথায় থাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি । ও এ ব্যাপারে কিছু জানত না । ইন্ডিয়া থেকে ফিরে ঢাকায় থাকাকালিন সময় ও একদিন রুম্পাকে দেখে । তারপর ও রুম্পার সাথে দেখা করে সব কথা খুলে বলে । রূম্পা ওর কষ্ট বুঝতে পারে এবং একসময় ওর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় । এমনকি ওর ব্যাক্তিগত কথাও শেয়ার করত । ও ওকে আপন বোনের মতই ট্রীট করত । এসব কিছুই ওর বাসায় জানত না এবং টুম্পা কাউকে যাতে না বলে এ ব্যাপারে রুম্পাকে সাবধান করেছিলো । টুম্পা নিজেকে ছোট মনে করবে দেখে রুম্পাও কিছু বলত না । এমনকি ওদেরকে একসাথে খুব কম মানুষই দেখেছে । কিন্তু এদিকে যে টুম্পা রুম্পাকে মারার প্ল্যান বানাচ্ছে তা রূম্পা ঘূনাক্ষরেও টের পায়নি । …………রুম্পাকেও একই গাছের বিষ দিয়ে খুন করে শয়তানটা । তারপর তাকে গাড়িতে করে শফিক সাহেবের বাড়ির গুদামঘরে রাখার ব্যাবস্থাও করে নিজেই । সবকথার শেষে ও বলেছে এসব নাকি ও সম্পত্তির লোভে করেনি ।

এতটুকু বলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে শিহাব সাহেবের বুক থেকে । রাব্বির মুখে বিষাদের ছায়া । নিজের বোন ও বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে তার । সে তপুর মামাকে বলে ।

-আচ্ছা, ইন্সপেক্টর সাহেব টুম্পা যদি আমাদের কাছে এসে বোনের মর্যাদা দাবি করত তাহলে কি আমরা দিতাম না?…….অবশ্যই দিতাম । এমনকি আমাদের সমান সম্পত্তি ওকে দিতাম । আমাদের বাবা যেই ভুল করেছে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতাম ।

তপুর মামা শিহাবের মুখে একটা বিদ্রুপের হাসি ।

-দেখ রাব্বি, …এই পৃথিবীতে মানুষ কারন ছাড়াও অনেক কাজ করে । তো এখন তো সম্পত্তি সব রাব্বির নামে সিফাত কি করবে?
-আরে আমি কি বলেছি পুরো সম্পত্তি আমি নেব । দলিল পাওয়া মাত্রই অর্ধেক সম্পত্তি সিফাতের নামে করে দেব ।


পুলিশ স্টেশন থেকে রাব্বি আর সিফাত আহমেদকে বেরিয়ে যেতে দেখল তপু । হাতঘড়িতে দেখল ৬.১১ বাজে । মামার একটা কথা খুব কানে বাজছে । ”এই পৃথিবীতে মানুষ কারন ছাড়াও অনেক কাজ করে । ”সত্যিই তো!! কোন কারন ছাড়াই সে এই কেসে জড়িয়ে পড়েছিল । যদিও কিছু অর্থের সমাগম হয়েছে ওর উপর দিয়েও কম ধকল যায় নি । ভবিষ্যতে এ জাতিয় কাজ হাতে নেয়ার আগে ব্যাপক চিন্তা ভাবনা করতে হবে । চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে । বাসায় যেতে হবে । রিনি নিশ্চয়ই তার মুখ থেকে সব শোনার জন্য মুখিয়ে আছে ।

রহস্যজনক মৃত্যু” সম্পর্কে ২টি মন্তব্য

  1. রহস্যের জটটা খুব চমত্কার ভাবে ছাড়িয়েছেন। ভাল লাগলো।
    একটা কথা, রুম্পা-টুম্পা তো আসলে বয়সে রাব্বি ও সিফাতের চেয়ে বড়, তাই না? গল্পের কয়েক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে রাব্বি আসলে রুম্পা-টুম্পার চেয়ে বড়, যেমন – “-হাই…আমি রূম্পা । শফিক আহমেদের মেয়ে…রাব্বি ভাইয়ার একটা জরুরী কাজ পড়ে যাওয়ায় অফিসে যেতে হয়েছে । তাই উনি এখানে নেই ।”

মন্তব্য করুন