ইন্দু

রবিবার । সোমনাথের অফিস ছুটি । ঐন্দ্রিলারও । তবে রবিবারের মজাটা সোমনাথের কাছে একটু আলাদা । কারন ও ঐন্দ্রিলার মত সরকারি চাকুরে নয় । রোজ সকাল সাতটায় উঠে ন’টার মধ্যে রেডি হয়ে দশটায় অফিস পৌছায় সোমনাথ । তারপর অফিসের ওই ছোট্ট ডেস্কে ২২ ইঞ্চি স্ক্রিনে ঠায় চোখ রেখে টানা ৪ ঘন্টা কাজের পর মেলে ৪৫ মিনিটের লাঞ্চ ব্রেক । তা সেরে পুনরায় একই চর্বিত চর্বন চলে রাত ৮টা অবদি । মাঝে দু-তিনবার বসের চোখ এড়িয়ে নিচে নেমে প্রিয় সিগারেটের সুখটান । শেষমেষ রাত ৮টায় অফিস ফিরতি পথে সহকর্মিদের ভেতর সেই কমন আলোচনা, ” It’s not worth!!! চার বছর ধরে B.Tech এর সিলেবাস ঠেসে ঠেসে গলা দিয়ে নামানো, তারপর স্বপ্নের আইটি সেক্টরে এসে দিনে ১০ ঘন্টা ধরে এই copy আর paste!!! মাঝে মাঝে তো ভুলেই যাই বাড়িতে বউ-বাচ্চাও আছে!!! ”
অফিস বাসে বাড়ি পৌছে ফ্রেস হতে হতে ডিনারের সময় চলে আসে । রাতের খাওয়া সেরে ড্রয়িং-রুমে এসে আধঘন্টা টিভির সামনে বসা । চ্যানেল সার্ফ করতে করতেই পরদিনের ছবিটা চোখের সামনে জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে সোমনাথের । চোখ ঢলে আসে । ঐন্দ্রিলার হাতে রিমোটটা হস্তান্তর করে বেড-রুমে এসে শোওয়া মাত্রই ঘুম ।
এই রুটিন মাসে ২৬ দিন ধরে copy আর paste হতে হতে যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করার উপক্রম হয় ঠিক তখনই মাসান্তে নিজের ব্যাংক একাউন্টে পাঁচ ডিজিটের credited রাশিটি সোমনাথের কাছে মনে হয় যেন চাতক পাখির কাছে প্রথম বর্ষার জল । এই সুখানুভুতিটুকু না থাকলে জীবন থেকে হয়ত অক্সিজেনই ফুরিয়ে যেত ওর ।
অপরদিকে ঐন্দ্রিলা সরকারি চাকুরে । দশটা-পাঁচটার ঢিলেঢালা রুটিন । বাড়ি থেকে অফিস একবাসে মিনিট পঁচিশের পথ । সাড়ে ন’টার বাস ধরার অভ্যাস । মাঝেমধ্যে শাড়ি বা সালওয়ারের সাথে ম্যাচিং টিপ খুঁজতে গিয়ে একটু দেরী হয়ে যায় । আধঘন্টা বা একঘন্টা দেরীতে পৌছালেও অ্যাটেন্ডেন্স শীটে লালকালীর সম্ভাবনা বিশেষ নেই । সারাদিন বসে বসে শুধু টেবিল ওয়ার্ক, একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে সহকর্মীদের নিয়ে অফিস ক্যান্টিনে গিয়ে আড্ডা । নিয়মমত পাঁচটায় অফিস শেষ হলেও মাঝেমাঝেই নানা ছুতোনাতায় আগে বেরিয়ে পড়া যায় । বাড়ি ফিরে একটু ফ্রেস হয়ে সংসারের টুকিটাকি কাজকর্মেই সময় চলে যায় ।
সেকারনে রবিবারের মজাটা দুজনের কাছে ভিন্ন । ঐন্দ্রিলার কাছে দিনটা প্রায় বাকি ছটা দিনের মতই । কিন্তু সোমনাথের কাছে রবিবার মানে অনেককিছু । ঐন্দ্রিলা জানে আজ সোমনাথকে ডেকে ঘুম থেকে তোলা যাবে না । দশটা-সাড়ে দশটা নাগাত নিজেই উঠবে । উঠেই তার এককাপ কফি চাই । কফি আর নিউজ পেপার নিয়ে বসবে, দোসর টিভি ।
রান্নার কাজে মায়াদিকে আজ হেল্প করতে করতে একফাঁকে ড্রয়িং রুমে আসে ঐন্দ্রিলা । সোফার উপর অগোছালো নিউজ পেপারগুলোকে গুছিয়ে পাশের টেবিলে রেখে সোমনাথের পাশে বসে । শেষ হয়ে যাওয়া কফির কাপ-প্লেট হাতে নিয়ে ঐন্দ্রিলা বলে,
” চলোনা, আজ কোথাও ঘুরে আসি ”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা । সম্যক কারন জানার পর সোমনাথের হাত থেকে টিভির রিমোটটা নিয়ে মিউট বোতামটি চাপে ঐন্দ্রিলা । টিভিতে বুঁদ হয়ে যাওয়া সোমনাথের যেন ছন্দপতন ঘটে ।
” কি হল? ”
” বলছিলাম যে আজ কোথাও ঘুরে এলে হয় না? ”
” কোথায়? ”
” ‘কোথায়’ আবার কি! তুমি বলো কোথায়? ”
” মহা মুশকিল! ঘুরতে যাবার ইচ্ছে তো তোমার ”
” হ্যা, তা বটে, ঘুরতে যাবার ইচ্ছে তো বরাবরই একা আমার । তা, তুমি ঠিক কর কোথায় যাওয়া যায় ”
আলসেমির আড়মোড়া ভেঙে সোমনাথ বলে,
” কি দরকার ঘুরতে যাবার! এই তো বেশ আছি বাড়িতে ”
” প্রত্যেক রবিবার কারও বাড়ি বসে থাকতে ভাল লাগে! কাছেপিঠে কোথাও ঘুরে এলে হয়না? ”
” দেখ, জানই তো এই একমাত্র রবিবারই একটু ফুরসৎ মেলে আমার । এই দিনটা একটু হাত-পা ছড়িয়ে বাড়িতে….”
” থাক, বুঝেছি…আর বলতে হবে না ” সোমনাথকে মাঝপথে থামিয়ে বলে ঐন্দ্রিলা । বলে কাপ-প্লেট নিয়ে উঠে চলে যায় কিচেনে । কিছুক্ষন বাদে বেরিয়ে বেড-রুমের দিকে যেতে যেতে নিজের মনেই বলে,
” মানুষের সখ-আহ্লাদ বলেও তো কিছু থাকে! বিয়ের এখনো চার বছরও পেরোয়নি, এর মধ্যেই সব রঙ ফুরিয়ে গেলে বাকি জীবন কি করব! শুধু অফিস-কাজ-সংসার! ”
ঘরে ঢুকে আলমারী থেকে গীতবিতানটি নামিয়ে খাটে বসে ঐন্দ্রিলা । একের পর এক পাতা ওল্টাতে থাকে । কোনও এক পাতার কোনও এক লাইনে এর উত্তর নিশ্চয়ই আছে । কবিগুরুর প্রতি ঐন্দ্রিলার গভীর আস্থা । মায়ের থেকে এই দুটো জিনিস পেয়েছে সে । নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবনটাকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে চালিত করার সাহস আর রবীন্দ্রনাথ । এই দুটো জিনিস তাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে শিখিয়েছে । হার না মানা অ্যাটিটিউড দিয়েছে তাকে । কিন্তু হার মানা বা না মানার ব্যাপার তো আসে যখন অপোনেন্ট থাকে, তা সে পরিস্থিতি হোক বা অন্যকিছু । এক্ষেত্রে অপোনেন্ট কোথায়!সোমনাথ না পরিস্থিতি? পাতা ওল্টাতে থাকে ঐন্দ্রিলা । কোথাও আছে এর উত্তর, অবশ্যই আছে, থাকতেই হবে । কবিগুরুর চোখকে কিছু ফাঁকি দিতে পারেনি । কিন্তু কোথায় উত্তর! হয়ত আছে…না না, নিশ্চয়ই আছে…কিন্তু কিছুতেই যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । কেন? নিজের অজান্তে ঐন্দ্রিলার মনই এপ্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয় । অনুভব করে ঐন্দ্রিলা সে এর উত্তর গীতবিতান থেকে আশা করে না, করে সোমনাথের কাছ থেকে । হ্যা, তাই হবে । বইটা সশব্দে বন্ধ করে উদাসী দৃষ্টিতে খোলা জানালার দিকে তাকায় ঐন্দ্রিলা । আনমনে অনেক ছবি ভেসে ওঠে তার মনে । চার বছর আগে বাবার বন্ধুর তরফ থেকে সোমনাথের সম্মন্ধ আসে ঐন্দ্রিলার । ছেলে ভাল, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার । বাড়ির সবার পছন্দ হয় । মা তখন অসুস্থ । টালমাটাল অবস্থা একদিকে । বিয়ের জন্য সেকারনে প্রস্তুতও ছিল না ঐন্দ্রিলা । বিয়ের আগে মাসদুয়েক সোমনাথের সাথে মেলামেশা করে ঐন্দ্রিলা বুঝতে পারে সোমনাথ প্রকৃত অর্থেই ভাল পাত্র । কম কথা বলা সীমিত ইন্টারেস্টের নেশাহীন সোমনাথের পরিধিটাও বিস্তৃত নয় । নিজের জগতে বাস করা মানুষ । বন্ধুবান্ধবও বিশেষ নেই, অফিস-বাড়ি, নিজস্ব কিছু সিলেক্টিভ মুভি আর গান, আর কিছু গল্পের বই, টিভির কিছু সিলেক্টিভ প্রোগ্রাম, এই নিয়েই অপরিসর সোমনাথের জগৎ । তাই খুব অল্প সময়েই তাকে চিনে ফেলতে অসুবিধা হয়না ঐন্দ্রিলার । ফাইনাল ডিসিশনটা নেবার আগে মাসতুতো বোন দেবপ্রিয়া ঐন্দ্রিলাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
” Indu di, are you sure? ”
খানিক ভেবে উত্তর দিয়েছিল ঐন্দ্রিলা,
” Yes Priya, nothing more to think about…anymore ”
তারপর বিয়ে । দেখতে দেখতে আজ প্রায় চারবছর হয়ে গেল । হানিমুন পর্বের পরও বছর দুয়েক ওরা টুকটাক এদিক ওদিক ঘুরতে যেত । তাও ধীরেধীরে কমতে থাকে । এখন তো বেড়াতে যাবার নামগন্ধও নেই । সোমনাথ কেমন যেন নিজের ভেতর আরও গুটিয়ে গেছে, একেতেই কম কথা বলা মানুষ, এখন আরও কম কথা বলে যেন । প্রয়োজন ছাড়া তাদের কথোপকথন প্রায় হয় না বললেই চলে । বিয়ের পর প্রথম প্রথম অফিস থেকে দুএকবার যাও ঐন্দ্রিলাকে ফোন করত, এখন তাও করেনা । একটা চাপা ফ্রাস্ট্রেশন কাজ করে সোমনাথের ভেতর সেটা বোঝে ঐন্দ্রিলা, একেতেই ওর অফিসে কাজের মারাত্মক চাপ তার উপর প্রোজেক্ট লীডার হওয়ার চান্সটাও ফসকে যায় গতবার । ঐন্দ্রিলা লক্ষ করেছে তারপর থেকেই কেমন যেন গুটিয়ে যেতে থাকে সোমনাথ । নিজের সমস্যা নিজের ভেতরেই রাখে, ঐন্দ্রিলার কাছেও প্রকাশ করে না । ঐন্দ্রিলা প্রথম প্রথম চেষ্টা করত বোঝবার, কিন্তু একটা দূর অবদি যাওয়ার পর আর এগুতে পারত না, যেন একটা দূর্ভেদ্য দেওয়ালের সামনে পড়ত ও । তার ওপাশে কি আছে সেটা জানা বা বোঝা ঐন্দ্রিলার সাধ্যে নেই । তাই এখন আর সে চেষ্টাও করে না । কারন চেষ্টার ফল যে এক অবধারিত long-time akward silence এ গড়াবে তা ও বুঝে গেছে ।
এসব কথাই আনমনে ভাবছিল ঐন্দ্রিলা । কাঁধে হালকা কাপুনিতে সম্বিৎ ফেরে তার । তাকিয়ে দেখে সোমনাথ ।
” চলো আজ ডিনারটা বাইরে সেরে আসব ”
কাঁধ থেকে সোমনাথের হাতটা নামিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ঐন্দ্রিলা । নিজের কম্পোজারটা ঠিক করে । টিপটা খুলে আয়নায় লাগিয়ে সোমনাথের দিকে না তাকিয়েই বলে,
” না থাক, বাড়িতেই ঠিক আছে ”
” I’m sorry, Indu ”
স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দেয় ঐন্দ্রিলা,
” কেন? ”
” আমাদের কোথাও যাওয়া উচিত ”
একটা হালকা স্বস্তির শ্বাস ফেলে ঐন্দ্রিলা স্মিত হেসে বলে,
” না, ঠিক আছে, থাক । একটানা পরিশ্রমে তোমারও এই একটা দিন বাইরে যেতে ইচ্ছা করে না সেটা আমি বুঝি ”
” তুমি একাও তো কোথাও ঘুরে আসতে পারো ”
” হ্যা, তাই যাব ভাবছি ”
” কোথায়? ”
” প্রিয়ার কাছে, আমার বোন, মনে আছে? ”
” কেন থাকবে না! ”
হালকা হেসে ঐন্দ্রিলা বলে,
” ভাল ”
সোমনাথ বুঝতে পারে জল অন্য দিকে বইতে শুরু করেছে ।
” তুমি রেগে আছ ইন্দু ”
অবাক হওয়ার ভংগীতে জবাব দেয় ঐন্দ্রিলা,
” কেন রেগে থাকব! ”
কাছে এসে দুহাতে ঐন্দ্রিলার দুই কনুই চেপে ধরে বলে সোমনাথ,
” ভেবে দেখ এতে রাগার কিছু নেই, আমার যায়গায় থাকলে তুমিও বুঝতে পারতে ”
” কি বুঝতে পারতাম? ”
কনুই ছেড়ে ঐন্দ্রিলার দুকাঁধে আলতো চেপে কিছুক্ষন ভেবে সোমনাথ বলে,
” It is what it is…Indu ”
বলে কয়েক পলক ঐন্দ্রিলার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘর ছেড়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে যায় সোমনাথ । তার চলে যাওয়ার পথের দিকে স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা । বেশ কিছুক্ষন পর নিজের মনেই বলে ওঠে,
” Yes…it is what it is ”


এর মাসদুয়েক পরের ঘটনা । আজ ঠিক দশটায় অফিসে এসেছে ঐন্দ্রিলা । এসেই বেয়ারাকে দিয়ে এককাপ চা আনিয়ে গতকালের অসমাপ্ত ফাইল নিয়ে বুঁদ হয়ে বসেছে । তিনটে নাগাদ বড়বাবুকে ফাইলগুলো বুঝিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে । একটা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে তাতে উঠে বসে । গন্তব্যের কিছুটা আগে নেমে ফুটপাথ দিয়ে একমনে হাঁটতে থাকে । অনেক অগোছালো চিন্তা ভিড় করে আসে মনে । ঐন্দ্রিলা কখনই কনফিউজড থাকা পছন্দ করে না, অন্তত করে নি । ওর জীবনযাপন, চিন্তাধারা বরাবরই একমাত্রিক, কিছুটা একরোখাও । যেটা ঠিক মনে করে বরাবর সেটাই করে এসেছে, তাতে তাকে অনেকসময় এমন কিছু ডিসিশন নিতে হয়েছে যা হয়ত সবাইকে খুশি করতে পারেনি । কিন্তু সেসব নিয়ে ও কখনই বেশি ভাবে নি । নিজের সামর্থ্য নিয়ে বরাবরই কনফিডেন্ট ছিল ও । কিন্তু সেটা বিয়ের আগের কথা । এ ক’বছরে ও অনেকটাই পালটে গেছে, অন্তত ও নিজে তাই মনে করে । এসব এলোমেলো চিন্তা করতে করতেই একটা প্রকান্ড খোলা গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ঐন্দ্রিলা । অবনতমস্তকে খানিক ভাবে, তারপর গেটম্যানের কৌতুহলি চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
” কেমন আছ গোপাল দা? ”
গেটম্যানের চোখে এবার বিস্ময়মাখা কৌতুহল ঝরে পড়ে । আমতা আমতা করে জবাব দেয়,
” ম্যাডামকে অনেকদিন পর দেখলাম! ”
” হ্যা……বহুদিন ”
বলে আলতো হেসে ভেতরে ঢুকে যায় ঐন্দ্রিলা । কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে ডানদিকে মোড় নেয় । বহুপরিচিত পথ যেমন মানুষ নিজের হাতের তালুর মত চিনতে পারে, ঠিক যেন সেরকমই সোজা হেঁটে একদম শেষপ্রান্তের কংক্রিটের বাঁধানো ফাঁকা বেঞ্চটায় গিয়ে বসে । কাঁধের অফিস ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রেখে বোতল বার করে একঢোক জল খায় । বোতলটিকে স্বস্থানে রাখার পর আবার সেই এলোমেলো চিন্তাগুলো গ্রাস করে ঐন্দ্রিলাকে । কেন এমন হল! কি ভুল হয়েছে ওর! কেন ও আর সোমনাথ আজ নদীর দুই তীরের বাসিন্দা! সোমনাথকে প্রথম দেখার দিন থেকে আজ অবদি প্রত্যেকটি পর্যায়ের ছবিগুলো যেন মূর্ত্য হয়ে ওঠে ওর চোখের সামনে । কিছুতেই না ভেঙে পড়া, না মুষড়ে পড়ার মানসিকতার ঐন্দ্রিলা আজ চিন্তিত! এমন এক সমস্যার সম্মুখিন যেটা ওর স্বভাবগত স্থির সোজা দৃষ্টিতেও ঝাপসা লাগছে ।
কপালের ভাঁজগুলো চওড়া হয় ঐন্দ্রিলার । ডানহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে কপালের মধ্যিখানে উপর নিচ ঘষতে থাকে । কতক্ষন এভাবে কেটে যায় বুঝতে পারে না ঐন্দ্রিলা । হঠাৎ ডান কাঁধে একটা হাত অনুভব করে ও । চিন্তায় ছেদ পড়ে । মুখ তুলে ঘুরে তাকিয়ে দেখে এক মাঝবয়সী সুদীর্ঘ সুঠাম পুরুষ দাঁড়িয়ে । ও কিছু বলার আগেই লোকটি ঘুরে বেঞ্চটার সামনে এসে ওর পাশে বসে । নীরবতায় কেটে যায় কিছু সময় । খানিক পর ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ঐন্দ্রিলাই বলে,
” দেরী করে আসার অভ্যাসটা গেল না তাহলে! ”
ওপাশের কোনো জবাব পায় না ঐন্দ্রিলা । লোকটি কেবল একটু মুচকি হেসে সোজা অনুভুমিকভাবে তাকিয়ে থাকে । আবার কিছুক্ষনের নীরবতা । শেষে লোকটি বলে,
” চিন্তিত মনে হচ্ছে? It doesn’t suit you ”
এক করুন হাসি খেলে ঐন্দ্রিলার মুখে ।
” অ্যাডাপ্ট করার চেষ্টা করছি । কেমন আছ তুমি? ”
” আছি একরকম । তোমার কথা বলো, তুমি কেমন আছ? ”
কোনও জবাব দেয় না ঐন্দ্রিলা । একদৃষ্টে সামনের লেকটার দিকে তাকিয়ে থাকে । তারপর আশপাশ চতুর্দিকে একঝলক তাকিয়ে বলে,
” এই পার্কে চারবছর কাটিয়েছিলাম তাই না! সেরকম কিছুই পালটায় নি । এই পার্ক, এই বেঞ্চ । হ্যা, শুধু বেঞ্চগুলোর রঙ পাল্টেছে দেখছি, আর পার্কে ভিড় একটু বেড়েছে ”
একদৃষ্টে লোকটা ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে থাকে । কথাশেষে ঐন্দ্রিলার সাথে চোখাচুখি হতেই চোখ নামায় ঐন্দ্রিলা । লোকটা বলে,
” এই পার্কের বর্ননা দিতেই কি কাল ফোন করেছিলে? কিভাবে জানতে পারলে আমার নাম্বার একই আছে? ”
” ট্রাই করে দেখছিলাম । আমিও ভেবেছিলাম তোমার এই নাম্বারটা হয়ত আর নেই । মাই গুড লাক, তুমি এখনো নাম্বারটা পাল্টাওনি ”
চোখাচুখি এড়িয়ে জবাব দেয় ঐন্দ্রিলা । একটা অদ্ভুত ব্যাপার অনুভব করে অবাক হয় । ও ভেবেছিল এখনও মেলামেশাটা স্বাভাবিকই হবে, যেমন হত ঠিক বছর চারেক আগে । যে চোখের দিকে দীর্ঘসময় অপলকে তাকিয়ে থাকতে পারত, আজ যেন সেই চোখজোড়ার দিকে তাকাতেই পারছে না । কিছুই নেই, অথচ কেমন যেন এক অদ্ভুত অদৃশ্য শক্তি তাকাতে দিচ্ছে না ।
” কি ব্যাপার বলো? হঠাৎ এই চার বছর পর তোমার ফোন…এখানে দেখা করতে বলা…Is everything ok? ”
জবাব দিতে একটু সময় নেয় ঐন্দ্রিলা । তার উদাসীন শূন্য দৃষ্টি লোকটার চোখ এড়ায় না । দুজনের মাঝে ঐন্দ্রিলার অফিস ব্যাগ সরিয়ে ঐন্দ্রিলার কাছে আসে লোকটা । ঐন্দ্রিলা যেন একটু অপ্রস্তুত অনুভব করে, সেটা বুঝে লোকটা আর এগোয় না । কিন্তু লোকটার সারা চোখেমুখে কৌতুহল উপচে পড়ে ।
” Ila, is everything ok? ”
” তোমার কি মনে হয় ‘everything ok’ থাকলে এভাবে চারবছর পর হঠাৎ তোমায় ফোন করে এখানে দেখা করতে বলি! আর প্লিজ, ওইনামে আর ডেকো না ”
” আমার কাছে তোমার ওই একটাই নাম…আমারই তো দেওয়া…তোমার এখন অপছন্দ হলেও আমি তোমায় ওই নামেই ডাকব ”
ঘাঁড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা । লোকটা এবার
ঐন্দ্রিলার কনুই ধরে জিজ্ঞেস করে,
” Ila, are you ok? ”
এবার ফিরে তাকায় ঐন্দ্রিলা । লোকটার চোখে সরাসরি তাকিয়ে বলে,
” Am I OK! Should I be ok! NO…I’m not OK…I wasn’t ok when I tried to understand you but couldn’t…I wasn’t ok when you left me without telling me ANYTHING…I wasn’t ok when I DESPERATELY awaited your come-back…I wasn’t ok when I was FORCED to marry someone else and there was still NO SIGN of you…I wasn’t ok when I tried to FORGET you but couldn’t…I wasn’t ok to COPE WITH a man who is a complete STRANGER to me now…so, please don’t ask if I’m OK…please Arnab ”
প্রায় একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে এক অদ্ভুত অনুরাগমিশ্রিত কৌতুহলি দৃষ্টি নিয়ে অর্নবের চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা । তারপর যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় । অর্নব এতক্ষন অবাক দৃষ্টিতে ঐন্দ্রিলার কথাগুলো শুনছিলো । এবার বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন সামনের লেকের জলের দিকে তাকিয়ে থাকে । কিছুক্ষন পর ঘুরে ঐন্দ্রিলার মুখোমুখি হয় । শান্ত গলায় বলে,
” You are right, Ila…You have every reason, every right to be angry with me. তোমার যায়গায় আমি থাকলে হয়ত আমারও হত । তুমি ভুল লোককে মন দিয়েছিলে ইলা! Yes, I’m serious. আমি তোমার জন্য পারফেক্ট চয়েস ছিলাম না ”
” কি বলতে চাইছ তুমি! চার চার বছর ধরে সম্পর্ক রেখে… এতকিছু হবার পর তারপর তোমার মনে হয় যে you were not my perfect choice! তুমি কি করে জানলে আমার পারফেক্ট চয়েস কি? ”
” জানি, চার বছরে তুমি আমায় কতটা চিনেছিলে জানি না ইলা, কিন্তু আমি হয়ত তোমায় চিনেছিলাম ”
ঐন্দ্রিলার ভুরু কুঁচকে আসে, এতকিছুর মধ্যে ও খেয়ালই করেনি যে কখন থেকে যেন ওই বহুপরিচিত চোখজোড়ার দিকে তাকাতে আর অসুবিধা হচ্ছে না । সেই অদৃশ্য শক্তিটা আর নেই । অর্নব বলে চলে,
” খুব প্রথমেই কেন যেন আমার মনে হয়েছিল যে আমাদের সম্পর্ক হয়ত শেষ অবদি গড়াবে না । আমি সরে আসতে চেয়েছিলাম । বহুবার মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে তোমায় বলব । কিন্তু তোমার সামনে গিয়ে, তোমায় দেখে, তোমার চোখের নিচের কালি দেখে আমার মুখ সরে আসে । আমি বুঝতাম যে…যাকে সোজা ভাষায় বলে…তুমি আমায় ভীষন ভালবেসে ফেলেছ । অথচ তখনো আমাদের ভেতর কিছুই হয়নি ”
ঐন্দ্রিলার চোখ যেন আক্ষরিক অর্থেই ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায় ।
” আমাকে তোমার পছন্দ ছিল না! তুমিই তো আমায় প্রপোজ করেছিলে! ”
” হ্যা ইলা, মনে আছে । তখন আমার জীবনটা অন্য খাতে বইছিল । I was in great tension…না, কারনটা তুমি নও…পারিবারিক । ইলা, আমার জীবনটা অত সিম্পল নয় । It is as it was…complicated…since ever…যখন টেনশন আর নিতে পারতাম না তখন নিজেকে ভীষন একা মনে হত । I was in constant fight…with me…always…ঠিক এরকম একটা সময়ে তুমি আস আমার জীবনে ”
” কিসের টেনশন! তুমি তো আমায় কখনো বলোনি এসব! ”
ঐন্দ্রিলার চোখে তাকিয়ে মৃদু হাসে অর্নব ।
” ইলা, এই প্রশ্নটা যদি চার বছর আগেও করতে…” বলে চুপ করে যায় অর্নব ।
ঐন্দ্রিলার কৌতুহলি চোখ উত্তর খোঁজে ।
” যদি করতাম…তো? ”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষন নীরব থাকে অর্নব । তারপর বলে,
” Past is past Ila…ওসব এখন শুনে কি হবে! ”
” আমার মনে হয় আমার জানা উচিত ”
” তুমি আমায় নিয়েই সুখী ছিলে…yes Ila…you were content with me.কিন্তু কখনো আমার ভেতরে কি চলছে সেটা তোমার চোখেও ধরা পড়েনি । তোমার দোষ নেই এতে, কারন তখন তোমার এসব বোঝার বয়সটাও ছিল না । মাথা ধরলে তুমি হাত বুলিয়ে দিতে, কিন্তু কখনো মাথাব্যথার কারন জানতে চাওনি ”
নির্বাক অনুসন্ধিৎসু নয়নে অর্নবের চোখে তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা ।
” আমিও আমার ব্যক্তিগত সমস্যা তোমায় বলে তোমাকে বিব্রত করতে চাইনি । যতক্ষন তোমার সাথে থাকতাম সব ভুলে থাকতাম, ওইটুকুই ছিল আমার রিলিফ ”
” তাহলে তোমার জীবনে আমি ছিলাম জাস্ট রিলিফ! ”
নির্বাক নয়নে কিছুক্ষন ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে থাকে অর্নব । তারপর বলে,
” না ইলা, শুধু তাই নয় । মনে আছে তোমার একটা সময় পর আমাদের সম্পর্কটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিল? হবারই কথা । You were vogue, trendy, modern, confident, practical and shallow…আর আমি…tensed.
We were worlds apart…still together…নিজের অনিচ্ছাতেও তখন সম্পর্কটা কিছুটা শারীরিক দিকে যায়, ভেবেছিলাম যদি এতে আমাদের সম্পর্কে কিছু গভীরতা আসে! তারপর একটা সময়ে…হ্যা, মনে হয় আমিও তোমায় ভালবেসে ফেলি । চেষ্টা করেছিলাম নিজেকে যতটা পালটে তোমার কাছে আসা যায় । কিন্তু ইলা…inside, we are what we are.বিয়ে একটা বড় ব্যাপার, ইলা । শেষের দিকে আমি ইচ্ছে করেই একটু দূরত্ব বাড়িয়েছিলাম তোমার সাথে, আমি শুধু একটু সময় চাইছিলাম…আমাদের সম্পর্কের ডেপথ টা বোঝার জন্য…দূরত্ব অনেক কিছু সমাধান করে বলে জানতাম, ইলা । কিন্তু তুমি আমায় আবার ভুল বুঝলে, ভাবলে আমি সরে গেছি । হঠাৎ করে বিয়ে করে নিলে ”
ঐন্দ্রিলার চোখজোড়া ছোট হতে হতে প্রায় বন্ধ হয়ে আসে, ভুরু কুঞ্চিত, কপালে চওড়া ভাঁজ, চোখেমুখে অবিশ্বাস মিশ্রিত বিস্ময় । অর্নব বলে চলে,
” I am, like my life, complicated, Ila…আর তুমি সিম্পল পৃথিবীর মানুষ । তাই, একদিকে ভালই হয়েছে…you deserved someone else…someone simple…simple like you. আমি ঠিক তোমার মত নই । তুমি তোমার সোজা দৃষ্টি দিয়ে একটা বাঁকা জিনিস দেখতে চেয়েছিলে, তাই পারোনি । আর তোমার পর এখন সত্যি বলতে কি আমি আশাও করি না যে কেউ আমায় বুঝুক বা জানুক বা চিনুক । কিন্তু…you deserved to be happy! ”
বিস্ময়ের ঘোরে ছেদ পড়ে ঐন্দ্রিলার । অর্নবের থেকে চোখ সরিয়ে সোজা লেকের জলের দিকে তাকায় । দীর্ঘসময় দুজনে চুপচাপ বসে থাকে । তারপর ঐন্দ্রিলা বলে,
” You see, how happy I am now! ”
বলে ছদ্ম কৌতুক ভরা চোখে তাকায় অর্নবের দিকে । অর্নবের সাথে চোখাচুখি হতেই আবার চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায় ঐন্দ্রিলা । অনেকক্ষন স্থির জলের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর অনেকটা নিজমনেই বলে,
” You are complicated…yes you are…also still impractical ”
” হবে হয়ত…but it’s not so simple either, Ila…for me ”
এরপর দীর্ঘসময় ধরে ঐন্দ্রিলা তার বিবাহিত জীবনের সমস্ত কথা শোনায় অর্নবকে । অর্নবও তার যত না বলা কথা ছিল সব শোনায় ঐন্দ্রিলাকে । বেঞ্চ ছেড়ে ঘাসের উপর বসে ওদের ক্ষনিকের জন্য মনে হয় সেই বেশ কয়েক বছর আগেকার স্মৃতি আবার যেন নতুন রূপে, নতুন মোড়কে, নতুন আঙ্গিকে ওদের সামনে হাজির । ঐন্দ্রিলা খেয়ালই করেনি কখন যেন অজান্তে ওর হাত অর্নবের হাত আর ওর মাথা সেই আদিম আশ্রয় অর্নবের কাঁধ খুঁজে নিয়েছে । ঐন্দ্রিলার কথা শেষ হবার পরও এভাবেই বেশ কিছুসময় ওরা পার করে দেয় । শেষে অর্নব উঠে দাঁড়ায় । হাত ধরে ঐন্দ্রিলাকে তোলে । ধীরপায়ে হেঁটে দুজনই পার্কের বাইরে আসে । একটু দূরত্ব রেখে দুজন হাঁটতে থাকে । একসময় ওরা একটা ফ্ল্যাটের কাছে এসে দাঁড়ায় । অর্নব বলে,
” সে রাতের কথা মনে আছে! তুমি যদি জোর করে ওই বৃষ্টির ভেতর ভিজতে ভিজতে চলে না যেতে…… ”
মাঝপথে অর্নবকে থামিয়ে ঐন্দ্রিলা বলে,
” I remeber it ”
তারপর দুজন ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে যায় । লিফটে করে তিনতলায় এসে পকেট থেকে চাবি বার করে একটা রুমের দরজা খোলে অর্নব । ভেতরে এসে দরজাটা আটকে দেয় । ঐন্দ্রিলাকে একান্তে পেয়ে জড়িয়ে ধরে অর্নব । হালকা বাঁধা দেবার চেষ্টা করে ঐন্দ্রিলা ।
” এটা ঠিক নয় অর্নব! ”
ওকে থামিয়ে অর্নব বলে,
” We never had a proper goodbye, Ila ”
ঐন্দ্রিলার বাধা দেবার শক্তিটাও যেন চলে যায় । চোখ বুঁজে অনুভব করতে থাকে অর্নবের হাত আর ঠোট ওর শরীরের নানান জায়গা খুঁজে নিচ্ছে । কাঁপতে থাকে ঐন্দ্রিলা । ওর জটপাকানো মাথা যেন হালকা হয়ে আসে । চিন্তার জালগুলো সব ছিড়ে যায়, ঝাপসা দৃষ্টিটা যেন পরিষ্কার হয়ে আসতে থাকে । অর্নবের আবেদনের কাছে আর সাড়া না দিয়ে পারে না । এভাবে কতক্ষন কেটে যায় বোঝে না ঐন্দ্রিলা । ছন্দপতন ঘটে অর্নবের মোবাইলের রিং এ । একঝলক মোবাইলটা দেখে ফোনটা কেটে দিয়ে সাইলেন্ট করে পাশে রেখে দেয় অর্নব । আবার ঐন্দ্রিলার কাছে ঘনিষ্ট হয়ে আসতে চায় । বাধা দিয়ে ঐন্দ্রিলা জিজ্ঞেস করে,
” কার ফোন? ”
” Not important ”
আবার মোবাইলে ফোনটা আসে । সাইলেন্ট মোডে থাকায় শুধু স্ক্রীনের আলোতে অর্নব বুঝতে পারে । আবার ফোনটা কাটতে যাবে এসময় বাধা দেয় ঐন্দ্রিলা । আঁড়চোখে ঐন্দ্রিলা পরিষ্কার বুঝতে পারে মোবাইল স্ক্রীনে ভেসে ওঠা নামটা…Bidisha…
অর্নবের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে ঐন্দ্রিলা,
” বিদীশা কে? ”
মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অর্নব । ঐন্দ্রিলার কৌতুহল বেড়ে যায় । বলে,
” কি হল! Who is this ‘not important’ Bidisha? ”
খাট থেকে নেমে জানালার ধারে যায় অর্নব । কিছুসময় পর ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে দেখে ঐন্দ্রিলা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তারই দিকে । অর্নব বলে,
” আমার বান্ধবী… ”
কৌতুহলি দৃষ্টিটা সন্দেহে নেমে আসে ঐন্দ্রিলার ।
” মানে….. ”
” তোমার বিয়ের পর আমার আরেকটা প্রেম হয় ইলা…I had to move on ”
ঐন্দ্রিলা বাকরূদ্ধ । মুখটা কিছুটা হা হয়ে আসে । হঠাৎ করে যেন লজ্জা পায় ওর । পাশে পড়ে থাকা ওর জামাকাপড় নিয়ে কোনওমতে লজ্জানিবারন করে ।
” Look Ila…I’m sorry…I…I…I… ”
খাট থেকে নেমে চটজলদি জামাকাপড় পরে নিয়ে অফিস ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়েই ঐন্দ্রিলা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয় । অর্নব সামনে এসে দাঁড়ায় ।
” Ila, I’m sorry ”
” No Arnab…actually I’m sorry ”
বলে এক রহস্য মাখা দৃষ্টিতে একপলক তাকায় অর্নবের দিকে । সে চাউনির অন্তর্নিহিত কোনো সুস্পষ্ট মানে অর্নব উদ্ধার করতে পারে না । দরজা খুলে বেরিয়ে যাবার মুহুর্তে ঐন্দ্রিলা একটা আলতো নিরীহ হাসি উপহার দিয়ে যায় অর্নবকে । বাকরূদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অর্নব ।
রাস্তায় এসে ফিরতি পথে যখন ঐন্দ্রিলা আবার সেই পার্কটার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সন্ধ্যা । নির্জন পার্কটার শেষ বেঞ্চটায় এসে আবার বসে । চারিধার ফাঁকা । দুহাতে নিজের চোখমুখ ঢেকে ধরে ঐন্দ্রিলা । সশব্দে ডুকরে কেঁদে ওঠে । অঝোর কান্না । ঐন্দ্রিলার আবেগের এ বহিঃপ্রকাশের কোনও দর্শক, শ্রোতা কেউ নেই আশেপাশে ।


অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সোমনাথ দেখে ঐন্দ্রিলা তখনো ফেরেনি । সাধারনত ওর অনেক আগে ফেরে ঐন্দ্রিলা । ফ্রেস হয়ে এককাপ কফি বানিয়ে আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে সোমনাথ । ল্যাপটপ টা নিয়ে বসে, অফিসের কিছু অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে হবে । ওর বস কিছু ফাইল ইমেল করে পাঠাবে, সেগুলো ফিল-আপ করে আবার বসকেই ইমেল করে ফেরৎ পাঠাতে হবে । ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের পর নিজের ইমেল একাউন্টের ইনবক্সে গিয়ে দেখে বেশ কিছু unread ইমেল । নিচ থেকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল গুলো ডিলিট করতে শুরু করে সোমনাথ । প্রয়োজনীয় ইমেল গুলোয় একঝলক চোখ বুলিয়ে নেয় । বস যে ফাইলগুলো পাঠিয়েছে সেগুলো ডাউনলোড করে নেয় । এই করতে করতে একদম উপরের ইমেলটায় চলে আসে । Sender-এর নাম দেখে ভুরুদুটো একটু কুঁচকে যায় । Arnab Ghosh, আজ সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ইমেলটা এসেছে । Subject field-এ লেখা “ভাল থাকিস”, হ্যা স্পষ্ট বাংলায় লেখা । ইমেল টা খুলে দেখে আদ্যপান্ত বাংলায় লেখা নাতিবৃহৎ এক চিঠিই বটে ।

সোমু,
এটাই তোকে বোধহয় আমার পাঠানো শেষ ইমেল । তোর দীর্ঘদিনের সমস্যা আজ শেষ করে দিলাম, তোর বিনা অনুমতিতেই । ঐন্দ্রিলা এবার আমাকে ভুলে যাবে, সেটা তুই ওর ডায়েরীতে ভবিষ্যতের লেখাগুলো পড়লেই বুঝতে পারবি । এই ডায়েরী পড়েই তোর এই সমস্যার সূত্রপাত । ঐন্দ্রিলার বরাবরের অভ্যাস ডায়েরী লেখা । সে লেখায় আমি থাকব এটা অবধারিত, কারন তোর আগে, তোদের বিয়ের আগে আমিই ছিলাম ওর সবকিছু । ওও ছিল আমার কাছে সেরকমই । আমাদের দূর্ভাগ্য যে আমাদের সম্পর্কটা বিয়ে অবদি গড়াল না । তাতে অবশ্য একদিকে ভালই হয়েছে, কারন আমার ধারনা তুই ওকে এবার আমার থেকে বেশী সুখী রাখতে পারবি । ইলা, মানে তোর ইন্দু, বরাবরই খুব একগুঁয়ে ছিল, অ্যারোগ্যান্টও বলতে পারিস, নিজে যা ঠিক মনে করবে তা করবেই । কিন্তু এখন ও অনেক পালটে গেছে । আজ ওকে দেখে আমিও অবাক হয়ে গেছি, মনে মনে ভাবছিলাম ” ইলা এত পালটে গেছে! ” যে ইলাকে কোনওদিন টেনশন নিতে দেখিনি, কোনওদিন ভেংগে পড়তে দেখিনি আজ দেখি তারই কপালে চিন্তার ভাঁজ! কারন আর কিছু নয়, তুই । ওর সিম্পল জীবনটাকে তুই বিষিয়ে তুলেছিস । একটা সামান্য ভুল বোঝাবুঝি আজ তোদের জীবন দুটোকে কোথায় ঠেলে দিয়েছে! কি দরকার ছিল তোর কারো পার্সোনাল লেখা পড়ার, সে যতই তোর বউ হোক না কেন! আর যখন পড়েই ফেলেছিলি, জেনেই ফেলেছিলি ঐন্দ্রিলার অতীত, তখন ওর সাথেই এব্যাপারে কথা বলে সব মিটিয়ে নিতে পারতিস । সেটা না করে তুই নিজেকে গুটিয়ে নিলি ঐন্দ্রিলার কাছ থেকে, তোর মনে সন্দেহ দানা বাধল । ও বেচারি আমাকে তো হারিয়েই ছিল, তোকেও হারাতে শুরু করল, একা হয়ে গেল পৃথিবীতে পুরোপুরি । তুই যেদিন প্রথম আমায় ফোন করে এব্যাপারে জানতে চাইলি আমি আকাশ থেকে পড়েছিলাম । ইলার বিয়ে হয়ে গেছে জানতাম কিন্তু সেটা আমারই বাল্যবন্ধুর সাথে এটা স্বপ্নতেও ভাবতে পারিনি । কি অদ্ভুত নিয়তি! স্কুলে পড়াশোনায় আমার বরাবরের কম্পিটিটর সোমু প্রেমেও আমার কম্পিটিটর হয়ে গেল! যাহোক আমিই দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলাম ইলার সাথে কথা বলতে, কিন্তু যেহেতু তুই ওকে কিছু বলিসনি আমিই বা কি করে বলি! তাছাড়া এতবছর পর ইলার মুখোমুখি হওয়াটাও আমার কাছে ভীষন চাপের হত । ইলাই আমায় ফোন করে সে সমস্যার সমাধান করে দেয় । ওর সাথে আজকের অভিনয় আমাকে প্রচুর কষ্ট দিয়েছে রে! আমার মাসতুতো বোনকে আমার প্রেমিকাও বানাতে হয়েছে । কিন্তু এছাড়া বোধহয় আর কোনও উপায়ও ছিল না । আমার পক্ষে ওকে ভুলে যাওয়া বা ওর পক্ষে আমাকে ভুলে যাওয়া কোনওদিনই সম্ভব ছিল না । আজকের পর ও হয়ত মন থেকেই আমায় ভুলে যাবে । তাতে তোদের সংসারটা বাঁচল, সর্বোপরি ইলার সংসারটা বাঁচল এটাই আমার পাওনা । কিন্তু আমাকে বাকি সারাটা জীবন ওর স্মৃতি বয়ে নিয়েই বেড়াতে হবে । দেখ, প্রত্যেকটা সম্পর্কের একটা আলাদা জায়গা থাকে মানুষের জীবনে, সেটা একান্তই তার নিজস্ব, সেখানে অন্য কারোর হস্তক্ষেপ করাটা অন্যায় । তাই অন্যের ডায়েরী পড়াটাও একপ্রকার অন্যায় । মানুষের জীবনে প্রাকবৈবাহিক সম্পর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা নিয়ে কাঁটাছেড়া করা কি ঠিক! ইলা কি কখনো তোর অতীত জানতে চেয়েছে? আমি জানি চায়নি, কারন আমি ওকে চিনি । ও ওর সব অতীত বিসর্জন দিয়েই তোর সংসার করতে এসেছিল, বিয়ের পর তুই ছিলি ওর সব । আমি শুধুই স্মৃতি । এখনও তোর ইন্দু তোরই আছে, সোমু । ওকে আর দূরে সরিয়ে রেখে কষ্ট দিস না । ওর কাছে এসে দেখিস ওর একটা বড় মাপের মন আছে যেটা সব ক্ষমা করে দিতে পারে । আর হ্যা, যতটুকু রহস্য এখনো রয়ে গেল সেটা রহস্যই রাখিস ওর কাছে ।
ভাল থাকিস,
…অর্নব ।

ইমেলটা পড়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয় সোমনাথ । স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সামনের জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া রাতের শহরটার দিকে । মনে হয় সবকিছুই কি দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে, শুধু ও’ই একজায়গায় স্থির হয়ে আছে । কফি কাপটা নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় । কতসময় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কেটে যায় বুঝতে পারে না সোমনাথ । একসময় নিচে তাকিয়ে দেখে ঐন্দ্রিলা গেট খুলে ঢুকছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৯টা বেজে ১৫মিনিট । এতরাত ইন্দু কখনও করে না ফিরতে । ব্যালকনির অন্ধকারে দাঁড়িয়েই সোমনাথ দেখতে পায় ঐন্দ্রিলা ঘরে এসে অফিস ব্যাগটা নামিয়ে রেখেই বাথরুমে ঢুকে যায় । শেষ হয়ে যাওয়া কফির কাপটা টেবিলে রেখে ল্যাপটপ-এ কাজ নিয়ে বসে পড়ে সোমনাথ । ঐন্দ্রিলা এসে ডিনার টেবিলে সব খাবার গুছিয়ে সোমনাথকে ডাকে । নিঃশব্দে খেতে খেতে আড়চোখে ঐন্দ্রিলার দিকে তাকায় সোমনাথ । সদ্যস্নাত ঐন্দ্রিলাকে আজ যেন একটু বেশিই সুন্দর লাগছে!
ডিনার সেরে আজ টিভির সামনে না বসে সোজা বেড-রুমে চলে আসে সোমনাথ । আধশোয়া অবস্থায় কোলের উপর ল্যাপটপটা রেখে বসের পাঠানো ফাইলগুলো শেষ করার কাজে মন দেয় । প্রায় ১১টা নাগাদ ঐন্দ্রিলা ঘরে ঢোকে । সোমনাথকে কাজে ব্যস্ত দেখে চুপচাপ ওর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে । কাজ শেষে আড়চোখে সোমনাথ দেখে ঐন্দ্রিলা জেগে আছে । ডান হাত কপালে রেখে ঐন্দ্রিলা স্থিরদৃষ্টে উপর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । কোলের ল্যাপটপ পাশের টেবিলে রেখে আধশোয়া অবস্থাতেই ঐন্দ্রিলার দিকে ঘোরে সোমনাথ । নিজের জগতে বিচরন করা ঐন্দ্রিলা সেটা খেয়ালই করে না । কপাল থেকে ঐন্দ্রিলার হাতটা নামাতে গেলে যেন সম্বিৎ ফেরে ওর । অবাকদৃষ্টে তাকায় সোমনাথের দিকে । ঐন্দ্রিলার হাতটা নিজের হাতে রেখেই সোমনাথ বলে,
” Indu, I’m really sorry ”
আরও অবাক হয় ঐন্দ্রিলা ।
” কেন? ”
” For……everything ”
কুঞ্চিত ভুরু আর কপালে চওড়া ভাঁজ নিয়ে সোমনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা । চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে, দীর্ঘদিনের অবদমিত আবেগ যেন উথলে বেরিয়ে আসতে চায় । এটা বুঝতে পেরে সোমনাথ ঐন্দ্রিলার মাথাটা টেনে নিজের বুকে চেপে ধরে । আর নিজেকে সামলাতে পারে না ঐন্দ্রিলা । যেন হাজার বছরের জমা কান্নার রাশি একবারে বেরিয়ে আসে । সোমনাথ ওর মাথাটা আরও জোরে নিজের বুকে চেপে ধরে । ঐন্দ্রিলার কান্না এতে গোঙানিতে রূপান্তরিত হয় । সোমনাথের নৈশবাসটা এতজোরে ঐন্দ্রিলা খামচে রাখে যে সোমনাথের রীতিমতো ব্যথা অনুভব হয় । কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারনে সে ব্যথাটাও আজ আর ব্যথা মনে হয় না ওর । কতক্ষন এভাবে কেটে যায় বোঝে না সোমনাথ । একসময় ঐন্দ্রিলার গোঙানি কমে আসে, আরও কিছুসময় পর ওর শরীরের কাঁপুনিটাও থেমে যায় । স্থির হয়ে সোমনাথের বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকে ঐন্দ্রিলা । ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সোমনাথ জিজ্ঞেস করে,
” চলো আসছে রবিবার কোথাও বেড়িয়ে আসি ”
সোমনাথের বুকের ওপর মাথাটা এপাশ-ওপাশ করে ঐন্দ্রিলা ।
” কেন? ”
এবার ঐন্দ্রিলা মাথা তোলে । সোমনাথ দেখে ঐন্দ্রিলার সারামুখে চোখের জলের সাথে চুলগুলো লেপটে একাকার হয়ে আছে । হাত দিয়ে সেগুলো গুছিয়ে দিয়ে আবার সোমনাথ জিজ্ঞেস করে,
” কেন? ”
অশ্রুসিক্ত লাল ফোলা ফোলা চোখে হালকা হাসির রেখা ফুটে ওঠে ঐন্দ্রিলার । বলে,
” Because…it is what it is ”
বলে সোমনাথের বুকে আবার মাথা রাখে ঐন্দ্রিলা । চোখজোড়া তার উদাসী দৃষ্টি নিয়ে ধীরে ধীরে যেন বহুদূরে হারিয়ে যায় । স্পষ্ট শুনতে পাওয়া সোমনাথের হৃৎস্পন্দনও যেন মিলিয়ে যায় । একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে পাশের টেবিলে রাখা টেবিল-ঘড়িটার টিকটিক সেকেন্ডের কাঁটাটার দিকে ।

জীবনের মুক্ত আবেগ উপভোগ করতেই একটু লেখালিখির চেষ্টা করি...কোনোভাবেই প্রফেশনাল লেখক নই...তাই যেকোনো রকমের সমালোচনা সমাদরে গ্রহন করব...

ইন্দু” নিয়ে একটি মন্তব্য

  1. সকল প্রকার সমালোচনা সমাদরে গৃহীত হবে…লেখালিখি আমি কখনো করিনি,কিন্তু ইচ্ছে ছিল বরাবরই কিছু লেখার…এটাই আমার প্রথম প্রয়াস,তাই কিছু বানান ভুল হয়ত আছে আর সব জায়গায় সঠিক শব্দপ্রয়োগও হয়ত হয়নি…তাই সকলের কাছে আশা রাখি যে অন্তত কিছু কমেন্ট করুন যাতে আমার ভুলগুলো চোখে পড়ে…আর পড়ে যদি ভাল লাগে তাহলে সেটাও জানান,কারন আপনাদের উৎসাহ ই আমাকে ভবিষ্যতে আরও কিছু লিখতে অনুপ্রেরনা যোগাবে।

মন্তব্য করুন