প্রেম-অপ্রেম


সাগ্নীক বরাবরই নিরামিষ টাইপের…ছোটবেলায় বাবা মারা যাবার পর সাগ্নীকের মা বাবার চাকরীটা পান…সেই থেকে দশটা-পাঁচটা করে সংসারের সমস্ত ঘানি প্রায় একা হাতে টেনে তিনি ছোট্ট সাগ্নীককে বড় করেছেন…একটা ঝি বাদ দিয়ে আর কোনো কাজের লোক পর্য্যন্ত কখনো রাখেন নি…ছোট থেকে তাই আগলে আগলে বড় হওয়া সাগ্নীক মায়ের কষ্টটা খুব কাছ থেকে দেখেছে…একটা সুখী পরিপূর্ন পরিবারের বিলাসিতা সে কখোনো না পেলেও তার মা কোনকিছুর খামতি রাখেন নি…যতটা সম্ভব নিজে বাবা এবং মা দুজনের ভূমিকাই পালন করার চেষ্টা করে গিয়েছেন…এই কুড়ি বছর ধরে…

এহেন সাগ্নীক প্রথম প্রথম আত্রেয়ীর ব্যাপারে অতটা কনফিডেন্ট ছিল না…একেতেই ওরকম সুন্দরী তার উপর আত্রেয়ীর ওই উইটি অ্যাটিটিউড বরং প্রথমে ভয় ভয়ই পেত…কিন্তু সেও তো বছর পাঁচ আগের কথা…এই পাঁচ বছরে গুটিয়ে থাকা সাগ্নীক নিজেকে আত্রেয়ীর সামনে ক্রমশ যতটা মেলে ধরেছে আত্রেয়ীও খুব সযত্নে ওকে ততটাই কাছে টেনে নিয়েছে…সেকারনেই হয়ত মায়ের পর আত্রেয়ীই এখন সাগ্নীকের জীবনে দ্বিতীয় নারী যার সান্নিধ্য ওর ভাল লাগে…তাছাড়া সাগ্নীকের জীবনে আত্রেয়ীর প্রয়োজনও তো কিছু কম নয়…এলোমেলো জীবনটাকে তো আত্রেয়ীই গুছিয়ে দিয়েছে…ঠিক যেন রিলে রেসে মায়ের ল্যাপ শেষে ব্যাটনটা এখন আত্রেয়ীর হাতে…

আজ সেই আত্রেয়ীর জন্মদিন…চাকরী পাবার পর গত আট মাসে সাগ্নীক ওকে সেরকম কিছুই দিতে পারে নি…আত্রেয়ীই বরং দিতে দেয় নি…বরাবর বলে এসেছে…

“যাও আগে সংসার ঠিক করো…মাকে হেল্প করো…ওসব পরে দেখা যাবে”

…গত সাতদিন ধরে চিন্তা করে করে তাই সাগ্নীক কিছুতেই ডিসাইড করতে পারছিল না এবার ওকে ঠিক কি দেওয়া যায়…শেষে অগত্যা মায়ের বুদ্ধিতেই ফোনের ব্যাপারটা মাথায় আসে…আত্রেয়ীর মোবাইলটাও সেকেলে হয়ে গেছে…তাই সাহস করে মোবাইল স্টোর থেকে এক বারোহাজারী স্মার্টফোন কিনেই ফেলে সাগ্নীক…সেই ফোন দেওয়া আর জন্মদিনে আত্রেয়ীর সাথে একটু একান্তে সাক্ষাত এ আশাতেই আত্রেয়ীকে বলেছিল আজ পাঁচটায় পার্কে আসতে…অথচ সোয়া পাঁচটা বেজে গেল আত্রেয়ীর কোনো পাত্তা নেই…উশখুশ সাগ্নীক পার্কগেটের সামনে ঠায় কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে…চোখ ঘুরে ঘুরে বারবার পার্কের দক্ষীন-পশ্চিম কোনে চলে যায়…যেখানে রাস্তাটা বাঁদিক বেঁকে সোজা পূব দিকে গেছে…ওদিক দিয়েই আসার কথা আত্রেয়ীর…শেষমেষ পাঁচটা পঁয়ত্রিশে সেই বহুপ্রতীক্ষিত চেনা অবয়বটার দেখা মিলল…দূর থেকে সাগ্নীককে দেখতে পেয়েই আত্রেয়ী প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে সাগ্নীকের ঠোঁট চেপে ধরল…

“স্যরি, প্লিজ ঝগড়া কোরো না…স্বাতী এসেছিল…প্লিজ প্লিজ প্লিজ…”

আত্রেয়ীর ওপর বেশীক্ষন রাগ ধরে রাখতে পারে না সাগ্নীক…আত্রেয়ীই থাকতে দেয় না…সাগ্নীক জানে যত রাগই হোক আত্রেয়ী এসে এমন উদ্ভট কিছু একটা বলবে বা করে বসবে যার মানে খুঁজতে খুঁজতেই ওর রাগ পড়ে যাবে…দুজনে মিলে পার্কের শেষদিকের উঁচু বাঁধানো জায়গাটায় গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসল…পার্কের এদিকটায় বিশেষ কেউ আসেনা…সাগ্নীক গিফট র‍্যাপারে মোড়া মোবাইল টা আত্রেয়ীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো…

“সো মেনি সুইট রিটার্নস অফ দ্য ডে ‘রি’ ”

“কি! আবার বলো”

“সো মেনি সুইট রিটার্নস অফ দ্য ডে”

“উহু…হলো না…আবার বলো…পুরোটা”

“সোও মেনি সুইইইট রিটার্নস অফ দ্য ডে ‘রি’ ”

একহাতে প্যাকেট টা নিয়ে অন্য হাতে সাগ্নীকের কপাল আর গালে সোহাগী হাত বুলিয়ে আত্রেয়ী বললো…

“হুম…এবার হয়েছে”

…বলে কুঁজো হয়ে বসা সাগ্নীকের বাম কাঁধে থুতনিটা রেখে কৌতুক ভরা চোখে তাকায় ‘রি’…

“এনিথিং এলস?”

…বলে ভুরুদুটো বারতিনেক উপর-নিচ করে…

ঠিক এই মুহুর্তগুলোকেই ডরায় সাগ্নীক…প্রথম প্রথম তো আত্রেয়ীর ইশারাগুলো ঠিকঠাক ধরতেই পারত না…এখন যদিও কিছুটা পারে…কিন্তু অতিসাহসী হলে তার ফল কি হবে বলা যায় না…রে রে করে তেড়ে এসে আত্রেয়ী বলতে পারে…

“রোমান্টিক বয়ের ধিঙ্গীপনাটি দেখো!…সারাক্ষন মনে মনে এইসব ঘোরে তাই না…চুপচাপ সরে বোসো”

…আর ভাগ্য ভাল থাকলে হয়ত কপালে জুটতে পারে আবেশে ভরা এক নিবিষ্ট চুম্বন…এতটাই আনপ্রেডিক্টেবল আত্রেয়ী…ভয়েভয়ে আঁড়চোখে একবার আত্রেয়ীকে দেখে নিয়ে সাগ্নীক বলে…

“হোয়াট এলস?”

চোখদুটো ঠিক রসগোল্লার সাইজ করে এক ঝটকায় নিচে নামে আত্রেয়ী…সাগ্নীকের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাতের তর্জনী আর বুড়ো আংগুল দিয়ে সাগ্নীকের দুগালের চামড়া টেনে লম্বা করে বলে…

“তোমার মত বোরিং লোকের সাথে কিভাবে ঘর করা যায় বলোতো!”

“এখনও সময় আছে…ভেবে দেখতে পারো”

…বলে সাগ্নীক গাল থেকে আত্রেয়ীর হাত ছাড়িয়ে ওর কাঁধে নিজের হাত রাখে…আত্রেয়ী আরো একটু ঘন হয়ে আসে…

“কি ভেবে দেখতে পারি?”

“স্মার্ট কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করতে পারো”

“হুম…তা পারি বটে…তাহলে এই বোরিং বয়ের কি হবে!”

…বলে ভাঁজ করা তর্জনী আর মধ্যমার মাঝে সাগ্নীকের নাঁক চেপে ধরে বারকয়েক ঝাঁকায় আত্রেয়ী…ব্যথায় শিরশিরিয়ে ওঠে সাগ্নীক…নাঁক থেকে আত্রেয়ীর হাত ছাড়িয়ে নিজের মুঠোয় শক্তভাবে ধরে বলে…

“উফফফ…’রি’ তুমি না কোনো জন্মে একটা ইয়ে ছিলে…”

খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে আত্রেয়ী…দুহাতে সাগ্নীকের গলা জড়িয়ে ধরে বাম কানে আলতো কামড় দিয়ে বলে…

“কি ছিলাম?”

“জানি না…তবে ভয়ংকর কিছু একটা হবে”

“বটে!…তো ভেবে দেখেছো এই ভয়ংকর ‘কিছু একটাকে’ বিয়ের পর কিভাবে সামলাবে! আর তো ক’মাস”

…বলে আত্রেয়ী সাগ্নীকের নাঁকে নিজের নাঁক ঠেকিয়ে ডান-বাম উপর-নীচ করতে থাকে…সাগ্নীক আত্রেয়ীর মাথার পেছনের চুল মুঠো করে ধরে নীচের দিকে একটু টান দেওয়াতে আত্রেয়ীর মুখ কিঞ্চিত উর্দ্ধমুখী হয়…ঠোঁটে আলতো চুমু খেলে সাগ্নীককে ঠেলে একটু দূরে সরিয়ে দিয়ে আত্রেয়ী বলে…

“উহু…ইয়োর টুডেজ চান্স ইজ গন মিস্টার…ফার গন!!!”

…বলেই সেই দুষ্টুমি ভরা হাসী নিয়ে তাকায় সাগ্নীকের দিকে…তারপর নিজেই আবার উপরে উঠে বসে সাগ্নীকের কাঁধে মাথা রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে…

“আচ্ছা বেলা বোস কাঁদে কেন?”

…এ প্রশ্নের কি জবাব দেবে আর জানে না সাগ্নীক…অন্তত পনেরো বার এই নিয়ে জোর তর্ক হয়েছে দুজনের…সাগ্নীকের বক্তব্য বেলা বোসের অন্য যায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে যায়…তাই কাঁদে…আত্রেয়ী মানতে চায় না…ওর বক্তব্য এতদিন পর ফাইনালি পুরোনো প্রেমিককে ফিরে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারে না…তাই কাঁদে বেলা বোস…

অগত্যা সাগ্নীক বলে…

“জানি না…অঞ্জনবাবুকে জিজ্ঞেস করো”

…যা হোক এ তর্কের সোজাসাপ্টা কোনো কিনারা হবে না বুঝে আত্রেয়ী সাগ্নীকের দেওয়া প্যাকেট টা খুলে মোবাইলটা বার করে…দেখেই বুঝতে পারে মোবাইলটা বেশ দামী…হাতে মোবাইলটা নাচাতে নাচাতে বলে…

“সাগ্নীক বাবুর ভাঁড়ার কি উপচে পড়ছে?”

“কেন…তোমার মোবাইলটা পুরোনো হয়ে গেছে তাই…”

” ‘তাই’ কি?…’তাই’ একগাদা টাকা খরচা করে মোবাইল কেনা…তাই তো…কি করব আমি এটা দিয়ে?”

“আগের মোবাইলে যা করতে তাই…প্লাস ইন্টারনেটও চাইলে করতে পারো”

আত্রেয়ী মোবাইলটা নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে…সুযোগ পেয়ে সাগ্নীক বলে…

“পছন্দ হয়েছে?”

দুহাতে সাগ্নীককে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে আত্রেয়ী…সাগ্নীকের লাল হয়ে যাওয়া নাঁকটায় কামড় দিয়ে বলে…

“না হয়নি…কি করবে বলো?”

 

আত্রেয়ী উচ্ছল…উইটি…আনপ্রেডিক্টেবল…কিন্তু ওকে ছাড়া জীবনটাও যে খানিক আনপ্রেডিক্টেবল একথা এই পাঁচ বছরে বেশ বুঝে গিয়েছে সাগ্নীক…

 


 

বিবস্বান আর সুচেতার সপ্তম বিবাহবার্ষিকী গেল গত সপ্তাহে…বিয়ের আগের তিন বছরের প্রেম নিয়ে মোট ১০ বছরের সম্পর্ক…একসময় বিবস্বানের ছাত্রী ছিল সুচেতা…সেখান থেকেই প্রেম…প্রেম থেকে বিয়ে…বিয়ে থেকে সন্তান…সায়ন্তন…ছয় বছর বয়স…তিন জনের ছোট্ট সংসার…বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই…টিউশন থেকে বিবস্বানের আয় এখন মন্দ হয় না বলে সুচেতাও প্রাইভেটের চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছে গতবছর…ছোট সংসার সুচেতার হিসেবী পরিচালনায় আরামসেই চলে যায়…সংসারের যাতাকলে পড়ে সুচেতা এখন অনেক পরিনত হলেও বরাবর ও কিন্তু এমন ছিল না…’ছিল না’ কি বরং উল্টোটাই ছিল বলা যায়…ছাত্রাবস্থায় তো একপ্রকার পাড়ার হট ফেভারিট ছিল…সে সময়ে আঁটোসাটো জিন্স-টপ পরা সুচেতা যথেষ্ট আধুনিকা…সমবয়সী বাকি মেয়েদের থেকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে…পড়ার ব্যাচে সবচেয়ে বুদ্ধিমতি ছাত্রী এবং ডাকসাইটে  হওয়ায় বিবস্বানের নজর ওর দিকেই পড়ে থাকত বেশীরভাগ…ক্রমে ক্রমে সেই থেকে পাড়ার মোড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বাকি রোমিওদের হতাশ করে বিবস্বানের সাথে প্রেম সুচেতার…তিন বছর ব্যাচ-পার্ক ব্যাচ-পার্ক করে অবশেষে সুচেতার পরিবারের পূর্ন অসম্মতিতে বিয়ে…আজ সেই সুচেতা প্রায় একা হাতেই বিবস্বানের সংসার সামলায়…জিন্স-টপ বহু আগেই আলমারীতে…বিবস্বানের হাজার অনুরোধেও ওসব ছোঁয় না…বলে ও বয়স নাকি চলে গেছে…বাদবাকি প্রায় সমস্তরকম বাহুল্যতা বা আধুনিকতা বিসর্জন দিয়ে এখন সুচেতা সাবেকি আটপৌরে গৃহিনী…ছেলে – স্বামী – সংসার এ নিয়েই সময়টা দিব্যি কেটে যায়…তবে একটা কথা কেন যেন মাঝে মাঝে মনে হয় সুচেতার…বিশেষ করে যখন একাকী থাকে…জানালার গরাদ হাতে শূন্য দৃষ্টে যখন তাকিয়ে থাকার অবসর মেলে…তখন কেন যেন মনে হয় এই রোজকার ঘরকন্না আর হাজারো ব্যস্ততার মাঝে ওর প্রেমটাই যেন কোথায় হারিয়ে গেছে…কে জানে হয়তবা এটাই নিয়ম…হয়ত এরকমই হয়…হয়তবা সময়ের সাথে সাথে প্রেমটাও স্রেফ একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়…ঠিক বুঝতে পারে না সুচেতা…মনে হয় প্রতিদিন একটু একটু করে সরে যেতে যেতে আজ ও আর বিবস্বান যেন নদীর দুই তীরের বাসীন্দা…আর সায়ন্তন সেই নদীর একমাত্র সেতু…

আজ রাতে অভ্যস্ত মিলনের পর যখন সুচেতা বিবস্বানের খালি বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে বিবস্বান তখন সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং বানাতে ব্যস্ত…সিগারেটের গন্ধ সুচেতার ভাল লাগে না…তবে সারাদিনে এই সময়টায় বিবস্বানকে ছাড় দেয়… বিবস্বানের পেটে আঙুল দিয়ে একটা গোল্লা এঁকে সুচেতা যেন আনমনেই বলে…

“তোমাকে এখন যেন চিনতেই পারি না”

সিগারেটের লম্বা ছাই মেঝেতে ঝেড়ে বিবস্বান বলে…

“কেন? ওকথা বলছ কেন?”

বুকের উপর মাথাটা ঘুরিয়ে বিবস্বানের নিস্তরঙ্গ চোখে তাকায় সুচেতা…খানিক্ষন একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে একটু স্মিত হাসে…বিবস্বানের কপাল আর চুলে হাত বুলায়…আবার আগের অবস্থানে মাথাটা এনে বলে…

“নাহ…কিছু না”

বিবস্বান উঠতে গেলে সুচেতা মাথাটা বালিশে এনে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ে…বিছানা ছেড়ে উঠে বিবস্বান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়…আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে আঁড়চোখে তাকায় শায়িতা সুচেতার দিকে…দূরের পার্কের নিয়ন আলো জানালা দিয়ে আবছা হয়ে এসে পড়েছে সুচেতার গায়ে…ওই আবছা আলোতেই সব দেখতে পায় বিবস্বান…সুচেতার নগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে আনমনে ভাবতে থাকে এই সাত-আট বছরে  সুচেতার শরীরের কার্ভগুলো কিভাবে যেন পালটে পালটে গেছে…সে বাধনটা আর নেই…ভাবতে ভাবতেই একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস…দৃষ্টিটা চলে যায় দূরের পার্কটার নিয়ন আলোর নীচের ঐ ফাঁকা বেঞ্চটায়…

 

বিবস্বান খেয়ালই করেনি…বিছানা ছেড়ে ওঠার সময় কখন যেন ওর বুঁক থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে…


 

সাগ্নীককে দেখলে এখন হট করে চেনাই যায় না…গত চার মাসে অনেকটাই শীর্নকায় হয়ে গেছে…ঘর থেকে প্রয়োজন ছাড়া বের হয় না…রাস্তায় চেনা কারুর সাথে দেখা হলে এক কি বড়জোর দুকথায় বাক্যালাপ মিটিয়ে চলে যায়…নিজের সাথে সারাদিন যুদ্ধ করে…আপ্রান চেষ্টা করে আত্রেয়ীর কথা মনে না আনার…এমনকি ঘরে আত্রেয়ীর যত স্মৃতি ছিল সব মাকে দিয়ে আলমারীতে তুলে রেখেছে…কিন্তু মন থেকে যে কিছুতেই আত্রেয়ীকে সরাতে পারছে না…মাও অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছেন…নিরুপায় হয়ে ব্যাপারটা এখন একপ্রকার সময়ের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন…অথচ বিয়ের আগে আত্রেয়ী ফোন করেছিল…তাও একবার নয়…বেশ কবার…সাগ্নীক তোলে নি… মাকেও তুলতে দেয় নি…নিরুপায় হয়ে শেষে আত্রেয়ী অনেক মেসেজ পাঠিয়েছিল…

“কেন এমন করছ? আমি কি ভুল করেছি?”

…ইত্যাদি…সাগ্নীক কোনো রিপ্লাই দেয় নি…শেষদিকে ফোন বন্ধই করে রাখত…মাকেও স্পষ্ট জানিয়ে রেখেছিল যেন কোনোভাবেই আত্রেয়ীর সাথে যোগাযোগ না করা হয়…এমন কি যোগাযোগের সামান্যতম সুযোগও যেন না হয় তাই বাড়ি পালটে অন্য পাড়ায় ভাড়া চলে এসেছে ওরা…শেষদিকে আত্রেয়ীও আর যোগাযোগের চেষ্টা করত না…শুধু ওর বিয়ের রাতে একটা শেষ মেসেজ পাঠিয়েছিল…

“ভাল থেকো…আমি আসি”

…সে রাতে ঘুমোতে পারে নি সাগ্নীক…মায়ের পাশে শুয়ে সারারাত জেগে ছিলো…মা সকালে ঘুম থেকে উঠে শুধু বলেছিল…

“ভাবিস না…সব ঠিক হয়ে যাবে”

…কিন্তু সাগ্নীকের মন বলেছিল…

“না মা…আর হয়ত কোনোকিছুই ঠিক হবে না”…

আত্রেয়ীর বিয়ে হয়ে গেছে আজ চারমাস…সাগ্নীক শুধু শুনেছিল ওর স্বামী ইঞ্জিনিয়ার…কোলকাতায় বাড়ি…স্বামী-শশুর-শাশুড়ি-গাড়ি-কুকুর নিয়ে আত্রেয়ীর ভরা সংসার…ভালোই আছে নিশ্চয়…আনমনে এসব ভাবতে ভাবতেই সেই পার্কটার পাশ দিয়ে আজ যাচ্ছিল সাগ্নীক…হঠাৎ কি মনে হলো…পার্কে ঢুকে সেই উঁচু নির্জন জায়গাটায় গিয়ে বসে…সেদিনের সব ঘটনা এখনো স্পষ্ট মনে আছে ওর…ঠিক যেন ছবির মত…মোবাইলটা সাগ্নীকের হাতে দিয়ে পার্কের বাইরে গিয়েছিল আত্রেয়ী…ভাজাভুজি কিনে আনতে…খালিপেটে প্রেম হয় না…

আত্রেয়ীর মোবাইলটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে থাকে সাগ্নীক…মেনুতে গিয়ে দেখে একগাদা নতুন নতুন এপ্লিকেশন ইন্সটল করা…এ কদিনেই আত্রেয়ী স্মার্টফোন ব্যবহার শিখে ফেলেছে…ফেসবুক…মেসেঞ্জার…হোয়াটসঅ্যাপ…ইউটিউব আরো অনেক কিছু…মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখে খান তিরিশেক বন্ধু যাদের সাথে মেসেজিং করে আত্রেয়ী…অধিকাংশই স্কুল বা কলেজ ফ্রেন্ড…কিছু অচেনা…অন্যের ব্যক্তিগত কথাবার্তা দেখা অন্যায়…কিন্তু আত্রেয়ী অন্য কেউ নয়…দেখা যেতেই পারে…একেক করে দেখতে দেখতে একটু বাদেই বোরিং লাগে সাগ্নীকের…অধিকাংশই বন্ধু বান্ধবের খুনসুটি মার্কা কথাবার্তা…একটা বাক্যালাপে এসে শুধু একটু অন্যরকম লাগে…বন্ধুর নাম ”বিবশ মন”…বাক্যালাপের প্রতিটি লাইন এখনো মনে আছে সাগ্নীকের…

“তোমাকে আমার বরাবরই পছন্দ আত্রেয়ী”

“রিয়েলী !!! মাই গড…ও মাই গড…আমি তো ভাবতেই পারছি না…আর ইউ সিরিয়াস !!!”

“হান্ড্রেড পারসেন্ট…প্রথম থেকেই…”

“আই ডোন্ট নো হোয়াট টু সে…বাট…আই থিংক মাই হার্ট উড এক্সপ্লোড !!!”

“হোয়াই?…তুমি কখোনো বোঝনি?”

“নো…নেভার…ইউ ওয়্যার সাচ এ বিগ থিং ফর আস!”

“বিগ থিং?…আস?”

“হ্যা…তোমার জন্য তো আমরা তিনজন পুরো পাগল ছিলাম”

“তিনজন !…মানে?”

“ইয়েস…তিন জন…আমি স্বাতী আর পায়েল…চার্লিজ অ্যাঞ্জেলস…মনে আছে?”

“স্বাতী মানে ঐ বিনুনি বাঁধা মেয়েটা? মাথা নিচু করে কোনোদিক না তাকিয়ে সোজা হাঁটত যে?”

“তোমার মনে আছে !!! হ্যা…ঐ মেয়েটাই”

“পায়েলকে মনে পরছে না…ও আচ্ছা…তোমাদের ত্রিমূর্তির তৃতীয় জন?”

“বাব্বা…তোমার এতকিছু মনে থাকে…তোমার তো মেমরী ভীষন শার্প !!!”

“শুধু মেমরী!…নজর নয়?…প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম তোমার ভেতর কিছু আছে”

“জানো…আমি প্রথম প্রেমপত্র লিখি তোমাকেই”

“কি বলছ?”

“সত্যি…বিলিভ মি…কিন্তু দিতে পারিনি…ভয়ে…বাব্বা…তোমার যা পার্সোনালিটি ছিল !!!”

“আমাকে তোমার পছন্দ ছিলো?”

“শুধু পছন্দ!!!…তুমি ছিলে আমার আইডল…এত স্মার্ট…শয়নে স্বপনে জাগরনে তখন শুধুই তুমি”

“রিয়েলী? নাউ আই অ্যাম ফ্ল্যাটার্ড”

“সিরিয়াসলি বলছি…তোমার বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে কত ফুচকা খেয়েছি…এক আশায়…হায়…যদি টল-ডার্ক-হ্যান্ডসামের দেখা একবার পাওয়া যায়”

“আচ্ছা আত্রেয়ী…একটা কথা বলব?”

“শিওর”

“যদি বলি আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই তুমি রাজী হবে?”

আর পড়তে পারেনি সাগ্নীক…চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল…গলা বুজে এসেছিল…নিজের চোখকে বিশ্বাস হয়নি সেদিন…আত্রেয়ী ফিরে এলে শরীর খারাপ লাগার ছুতো দিয়ে চলে এসেছিল…পেছনে আর তাকায়নি…তাকাতে পারেনি…তাকালে দেখতে পেত আত্রেয়ী দুহাতে দুটো ঠোঙা নিয়ে অপলকে বোবার মত দাঁড়িয়ে…

 


 

দূরের পার্কটার সেই ফাঁকা বেঞ্চটা…এখন রাত আটটা কুড়ি…ইতিউতি দুএকজন বাদে প্রায় নির্জন…একা বসে বিবস্বান…নির্জনতাই ওর এখন ভাল লাগে…হঠাৎ করে নির্জন হয়ে যাওয়া এই পার্কটার সাথে কোথায় যেন ওর মিল আছে…এই তো সবই ছিল…ও ছিল…সুচেতা ছিল…সায়ন্তন ছিল…সংসারটা ছিল…সময়ের নাগপাশে পড়ে শেষ হতে হতে অবশিষ্ট প্রেমটুকুও ছিল…তবুও তো ছিল…সুচেতা সেইযে বাপের বাড়ী গেছে আজও আসেনি…সাথে সায়ন্তনকেও নিয়ে গেছে…যাবার সময় বলে গেছিল ওর মা’র নাকি শরীর ভীষন খারাপ…মাকে দেখতে যাচ্ছে…কদিন থাকবে…খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিল…কিন্তু আজ ছমাস কেটে গেছে…সুচেতা ফেরেনি…প্রথম প্রথম ফোন করলে বলত আর কদিন বাদেই ফিরবে…মা প্রায় সুস্থ…কিন্তু এখন আর ফোন ধরে না…কেন ধরে না তাও বিবস্বান এখন জানে…অন্তত বোঝে…প্রথমে বুঝতে পারেনি…আর এখন বোঝে বলেই সুচেতার মুখোমুখি হতে পারে না…সে সাহস ওর নেই…কারন সুচেতাকে ও চেনে…সুচেতার ধৈর্য্যের বাঁধ অনেক উঁচু…শেষ অব্দি  দেখে…কিন্তু সে বাঁধ ভেংগে গেলে মুশকিল…এবার তাই হয়েছে বিবস্বান বেশ বুঝতে পারছে…এখান থেকে বাকীটা আর ওর হাতে নেই…সব নির্ভর করছে সুচেতার উপর…আর সুচেতা এত সহজে ফিরবে না তাও ভালভাবেই জানে…এখন মনে হয় সুচেতা অনেক আগে থেকেই সব বুঝেছিল…কিন্তু কিছু বুঝতে দেয় নি…চুপচাপ সব দেখছিল…দেখছিল বিবস্বান কতদূর যেতে পারে…কতদূর গিয়ে ফিরে আসে…যখন দেখেছে অনেক দূর চলে গেছে তখন নিজেই সরে এসেছে…কোনো বাধা দেয় নি…এই হল সুচেতা…

মোবাইলটা বার করে বিবস্বান দেখছিল সেই মেসেজগুলো যা নিশ্চয় সুচেতাও দেখেছে…দেখেই নিশ্চিত হয়েছে…সেই রাতে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে মেসেজ পাঠিয়েছিল বিবস্বান “যদি বলি আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই তুমি রাজী হবে?”

…তার পরদিন সুচেতা চলে যায়…তারিখটা মনে আছে বিবস্বানের…১৮ই এপ্রিল…

মেসেজ স্ক্রীনটা স্ক্রল করে ওপরে তুলতে থাকে বিবস্বান…১৮ই এপ্রিল রাত দশটা পঁচিশে রিপ্লাই আসে…

“মাই গড বিবস্বানদা…আর ইউ ক্রেজি!… সত্যি পারোও বটে তুমি!!!…হ্যাঁ…তোমায় নিয়ে একসময় দিনরাত স্বপ্ন দেখতাম বটে…ভাবতাম তোমার মত একটা বয়ফ্রেন্ড থাকলে ফাটাফাটি হতো…তোমার কাছে তখন শাহরূখ-সলমান-ঋত্বিক সব স্রেফ ডাহা ফেল ছিল…কিন্তু সে দশ বছর আগের কথা…তখন আমি ষোড়শী…নীল জল দীগন্ত ছোঁয়ার বয়স তখন…কিন্তু এই দশ বছরে অনেক কিছু ঘটে গেছে…আমার একটা প্রেমিক জুটেছে আজ পাঁচ বছর…বোরিং প্রেমিক…কিন্তু ও আমাকে ছাড়া আর কিছু বোঝে না…বলে আমিই নাকি ওর সবকিছু…রিয়েলী বোরিং…না!…কিন্তু ঘটনা হলো ওই বোরিং পাবলিকটাকে ছাড়া যে এখন আমিও আর কিছু ভাবতে পারি না…আর চারমাস বাদে আমাদের বিয়ে…আমার আর ওর দুবাড়ীর অনুমতিতেই…তুমি আমার প্রাক্তন প্রাইভেট টিউটর…বিয়েতে তোমার আর সুচেতাদির নেমন্তন্য থাকবে…অবশ্যই…অবশ্যই আসতে হবে কিন্তু”

জীবনের মুক্ত আবেগ উপভোগ করতেই একটু লেখালিখির চেষ্টা করি...কোনোভাবেই প্রফেশনাল লেখক নই...তাই যেকোনো রকমের সমালোচনা সমাদরে গ্রহন করব...

মন্তব্য করুন