বৈবাহিক

“খোলো খোলো দ্বার…রাখিওনা আর…বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে”
“আজ সারারাত থাকো তুমি ঐখানে খাড়ায়ে” দরজা খুলে ফ্রেমে হেলান দিয়ে পথ আটকে বলে বন্যা ।
“বেল থাকতে দরজা ধাক্কাচ্ছো কেন?”
“হাত তুলতে পারছি না…বেলের স্যুইচ বড্ড উপরে”
নির্বাক অনুসন্ধিৎসু নয়নে অনির্বাণকে খানিক পর্যবেক্ষণ করে বন্যা ।
“ইয়ার্কি হচ্ছে?”
“ইয়ার্কি কেন!…প্রথমে বাসে বাদুড়ঝোলা…তারপর ট্রেনে হকারের ঠেলা…তার উপর দশমণ এই বাজারের ব্যাগ…ভাঙতে হয় বাহাত্তর সিঁড়ি…এক শরীর আর কত টানতে পারে বলো!”
“রোজই তো হও বাদুড়ঝোলা…খাও হকারের ঠেলা”
“তার উপর বৌয়ের এই কানমলা”
“কি?”
“কিছু না…নাথিং…ভেতরে আসতে পারি?”
“ক’টা বাজে?”
“কই বেশী বাজেনি তো…সবে আটটা কুড়ি…মাত্র কুড়ি মিনিট লেট”
“বেশ…তবে সারারাত থাকো আজ খালিপেট”
“মানে?”
“মানেটি অতি সোজা…নো রন্ধন…নো বাইরের খাবার ভক্ষন”

বলে বাজারের ব্যাগ নিয়ে পথ ছেড়ে ভেতরে চলে যায় বন্যা ।

অনির্বান স্নান সেরে শোবার ঘরে এসে দেখে বন্যা শুয়ে আছে ।
অনির্বাণকে দেখে কনুই ভাঁজ করে হাতে মাথা রেখে বলে…
“কি চাই?”
“ঘরেও আসতে পারব না!”
“আরও একটা ঘর আছে…সেখানে যাও…গিয়ে শুয়ে পড়ো”
“সিরিয়াসলি!…আজ রান্না হবে না?”
“না”
“এতো রীতিমত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন”
“নইলে যে বাগে আসবে না এই দু:শাসন”
“কি যা তা বলছ…মাত্র তো কুড়ি মিনিট লেট…তাও কি এমনি এমনি নাকি”
“ও…এখনো আছে কৈফিয়ত বাকি!”
“কৈফিয়ত কেন হবে…না না কৈফিয়ত না”
“তবে কি শুনি”
“বড়বাবু নেই…অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনি…”
“এতো হররোজ কি কাহানি”
“তার উপর বেরোতে যাব তখন রেবা…”
“আবার ঐ রেবা!”
“আহ হা…শোনো না…রেবা বললো ওর সাথে নিউমার্কেট যেতে…ছেলের স্কুলড্রেস কিনবে…জানোই তো দাদা দাদা বলে”
“আর তুমিও গড় গড় করে চলে গেলে!”
“কি করবো বলো…জানোই তো সবে ডিভোর্স হয়েছে…এক ছেলে…সবদিক সামলাতে পারে না”
“তুমিও ‘আহারে রেবা’…’উহুরে রেবা’…করে পেছন পেছন হন্টন…কেন, অফিসে ওর আর ‘দাদা’ নেই? নাকি শুধুই ‘অনিদা’?”
“থাকবে না কেন? সবাই তো আছে…কিন্তু ও আমার উপর একটু বেশী ডিপেন্ড করে”
“তা কেন করবে না!…এমন লালু ‘অনিদা’ ভুলু ‘অনিদা’ আর কোথায় পাবে বলো!”
“মানে! আমি লালুভুলু?”
“নিশ্চয়ই…তাছাড়া আর কি!…শুধু চেনটাই যা নেই”
“ও আমার বোনের মত”
“সে তো জানিই…বোনের ডিভোর্স হওয়ায় দাদার সেদিন কি হাঁপুস হুঁপুস!…”চিন্তা কোরোনা আমরা তো আছি”…”যখন খারাপ লাগবে ছেলেকে নিয়ে চলে এসো”…বাড়ী তো নয়…যেন লঙ্গরখানা”
“এটা আমাদের সিভিক ডিউটি”
“থামো!…’সিভিক ডিউটি’!…সিভিক ডিউটি না বিউটি আমি ভালো করে জানি”
“মমম্…মানে! কি জানো?”
“এই যে আমায় নিয়ে প্রতি রোববার তোমার মর্নিং ওয়াক আর ময়দান…ওটা যে এই অছিলায় তোমার শর্টস পরা তন্বী দর্শন…ভাবো বুঝি না!”
“তুমি একটু বেশীই বোঝ…তাছাড়া ময়দান কি আমার বাবার পার্সোনাল প্রপার্টি নাকি!…ওখানে সবাই আসতে পারে…ঠিক আছে…তোমার তাই মনে হলে এবার থেকে ময়দান বাদ…তুমিই বলো কোথায় যাওয়া যায়”
“নরক…ঐ একটি জায়গাই আছে…নো বোন নো শর্টস…শুধু গরম তেল…যাবে?”
“ওখানেই তো আছি”
“কি?”
“না…কিছু না”
“কি বললে পষ্ট করে বলো”
“বলছি নরকেই তো আছি…এটা ঘর না নরক!…সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি…বাড়ী এসে বৌয়ের টিপ্পনী…ধ্যাত…কেন যে লোকে বিয়ে করে!”
“ও…তাই, না!…উনি হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন আর আমি বাড়ী বসে রূপচর্চা করি!”
“তাই তো করো”
“বেশ…কাল ৬টায় উঠে তুমি ঘর ঝাড়-পোঁচ করবে…বিছানা গোছাবে…রান্না করবে…ঝি না এলে বাসন মাজবে…মাসকাবারী বাজার করবে…সংসারের হিসেবপত্তর রাখবে…তারপর সময় পেলে আয়নার সামনে গিয়ে মুখে স্নো-পাউডার ঘষবে…কেমন?”
“তুমি আমার অফিসটি কোরো…দুদিনেই ড্রেসিং-টেবিলে গিয়ে ‘ফুলে ফুলে দুলে দুলে’ ঘুরে খালি ফিগার দেখা বেরিয়ে যাবে”
“শোনো…খালি ঐ অফিস করার খোঁটা দিও না…যা না অশ্বডিম্ব চাকরী করো!…পাঁচ বছরে তো এলটিসি নিয়েও ওই দীঘা-শিলচর টপকাতে পারলে না”
“তাও তো গেছি…এই বা ক’জন যায়!”
“তুমি বাদ দিয়ে না সবাই যায়…খোঁজ নিয়ে দেখোগে…খোঁজই বা নেবে কখন!…সারাদিন তো রেবা বুনুর পেছনে ল্যাজ নেড়ে নেড়ে ঘুরে বেড়াও…অথচ বিয়ের পর সে কত রোমান্স!…কত কথা!…তোমায় নিয়ে যাব আমি সপ্তসাগর পার…মনে আছে?”
“এখন একটু সঞ্চয় করছি…পরে নিশ্চয় যাব”
“হ্যা…তাই যেও…আমার চিতাভস্ম নিয়ে কাশী যেও…আমার স্বর্গলাভও হবে আর তোমার তীর্থযাত্রাও হবে”
“তুমি যাবে স্বর্গে! স্বর্গের স্ট্যান্ডার্ড এখন এত খারাপ!”
“তবে কি তুমি যাবে!…তোমার স্ট্যান্ডার্ড তো বরাবরই আইআইটি, না! বিয়ের আগে তো একটা প্রেমও করতে শুনেছি…সে বেচারী তো ওয়েট করে করে শেষে অন্য যায়গায় বিয়ে করে বেঁচে যায়…তোমারই যাওয়া উচিত স্বর্গে, ঠিক!”
“কোন আবেগে যে তোমায় ওকথা বলেছিলাম!”
“মনে নেই?…সেই বরসাত কি রাত…হাথো মে হাথ…কত প্যার কি বাত!…কত ঘ্যানঘ্যান…কত প্যানপ্যান…আমার চোখে চোখ রেখে নাকি ভুলতে পারো হাজার বনলতা সেন!…মনে পড়ছে?”
“আবেগে সবাই ওরকম একটু আধটু বকে…ওসব ধরতে নেই…তুমিই বা এমন খইয়ের মত ফুটছ কেন!…ভুলে গেছো চার চার বার রিজেক্ট হওয়ার পর তোমার বাবা ফাইনালি আমায় ফাঁসান…ফাঁসিয়ে নিজে বাঁচেন…আর আমি দড়ি-কলসী গলায় বেঁধে এখন জলে”
“কি বললে! আমি তোমার গলার দড়ি-কলসী!”
“এ নরকে সংসার করার থেকে জঙ্গলে চলে যাওয়া অনেক ভাল…ওখানে বাঘের পেটে গেলেও অন্তত কেউ তো স্লো-পয়জনিং করে মারবে না”
“আমি তোমায় স্লো-পয়জনিং করছি!”
বন্যার চোখে গঙ্গা যমুনার বারিধারা । অবনত মস্তক । দুহাতে শাড়ীর আঁচলে গিঁট বাঁধা আর ছাড়ানো ।
“এই তোমাদের শেষ অস্ত্র!…দূর ছাই…কোত্থেকে কোথায় চলে গেল সব”
অনির্বাণ দরজামুখো ।
“দাঁড়াও…যাচ্ছ কোথায়?”
“জাহান্নামে…যাবে?”
“খবরদার বাড়ী থেকে বেরোবে না!”
“কেন? তোমার হুকুমে সব চলবে নাকি?”
“চলবে বইকি”
বন্যা সদর দরজায় এসে অনির্বাণের সামনে দাঁড়ায় ।
“সরে যাও”
“কোথায় যাবে এই রাত্তিরে? রেবা বুনুর বাড়ী?”
“দরকার হলে তাই যাব…এই নরকে আর নয়”
“শোনো এত সহজে ছাড় পাবে না…দড়ি-কলসী যখন গলায় বেঁধেছো ডুবতে তো হবেই”
“তাহলে এক কাজ করো…তুমি এখানে ডোবো…আমি বাইরে গিয়ে ডুবি”
“আমার নাম ভুলে গেছো!…বন্যা…যেখানে যাবে ভাসিয়ে নিয়ে যাব…সিধা ভেতরে চলো”
ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অনির্বানকে ঘরে ঢোকায় বন্যা । জোরজবরদস্তি করে ডাইনিং এর একটা চেয়ারে বসায় । একটা প্লেটে ফ্রায়েড-রাইস দিয়ে বন্যা বলে…
“মাটন-কষা না চিলি-চিকেন?”
দুটোই অনির্বানের ফেভারিট…অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে…
“খিদে নেই”
“নেই বললেই হলো!…তাড়াতাড়ি বলো…আমার পেট চোঁ চোঁ করছে”
“তোমার খিদে পেয়েছে তুমি খাও…তাছাড়া এসব এলো কোত্থেকে?”
“কেন!…তুমি বাজার না আনলে কি রান্না হবে না?…আমি তো সারাদিন আয়নার সামনে দুলে দুলে ফিগার দেখি তাই না!”

অনির্বাণ চুপ । বন্যা চিলি-চিকেন দিয়ে কিছুটা ফ্রায়েড-রাইস মেখে অনির্বাণের মুখের সামনে ধরে…
“নাও, শিগগির গেলো এসব…নিজের ম্যারেজ-অ্যানিভার্সারি বলে একদিন বলেছিলাম একটু আগে আসতে…তা না করে বাবু গেছেন নিউমার্কেট…বুনুর শপিং করতে…এসে একগাদা বাহানা…নাও খাবে তো, নাকি?”
অনির্বাণ পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা ভেলভেটের ছোট বাক্স বার করে টেবিলে রাখে…বন্যা বাঁহাতে বাক্সটা তুলে নেড়েচেড়ে বলে…
“কি এটা?”
“খুলে দেখো”
বন্যা খুলে দেখে একটা ছোট্ট হীরে বসানো সোনার আংটি…অনির্বাণ বন্যার অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দিয়ে বলে…
“আমি বুনুর সাথে যাইনি…বুনু আমার সাথে গেছিলো”

বন্যা চুপ । অধোবদন । অনির্বাণ দুহাতে বন্যার মুখ তুলে চিকচিকে চোখের কোণ বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে সুর করে গেয়ে ওঠে…
“ওগো সজল নয়না হরিণী…”
বন্যা প্লেটগুলো ঠিক করতে করতে বলে…
“গানটাও ঠিক জানো না…ওটা ‘সজল’ নয় ‘কাজল’…ওগো কাজল নয়না হরিণী…”
“ওই হলো…আবেগটাই আসল…কথা দিয়ে কি হবে?”
“কাল তো রোববার…তা তোমার বুনুকে বলো আসতে…দশমণি বাজার নিয়ে এসেছো…কে খাবে?”

জীবনের মুক্ত আবেগ উপভোগ করতেই একটু লেখালিখির চেষ্টা করি...কোনোভাবেই প্রফেশনাল লেখক নই...তাই যেকোনো রকমের সমালোচনা সমাদরে গ্রহন করব...

মন্তব্য করুন