কিছু স্মৃতি,কিছু আর্তনাদ।

রাত তিনটা । আমি স্টাডি রুমে । খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু পড়ছি বলে মনে হচ্ছে না । কিন্তু এতো রাত জেগে খুব ভালো কিছু পড়ার ইচ্ছাটাও খুজে পাচ্ছি না । রাত জাগার এই অভ্যাসটা আমার অনেক আগের, সেই ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই । শখের কিংবা অভ্যাসের বশে, রাত জেগে বসে আছি ব্যাপারটা আসলে এইরকম না । আমার আসলে ঘুম হয় না । হয় না অনেকদিন থেকেই । রাত জেগে জেগে শুধু ব্লাড প্রেসারটা বাড়ে, আর কিছু হয় না । প্রিয়ম বড় হচ্ছে । প্রিয়ম আমার ছেলে । এইতো সেইদিন হল, পিচ্চি ফুটফুটে একটা বাচ্চা । কি সুন্দর, নরম তুলতুলে । আজকে সে মাকে বলে, “মা, টেক কেয়ার । আমি স্কুল এ গেলাম । ঠিকমত লাঞ্চ করে নিও । ভালো থাকো মামনি । আমাকে নিয়ে টেনশন করো না । ” না, ছেলেকে নিয়ে আমি কখনই টেনশন করি না । প্রিয়ম এর রুমের পাস দিয়ে বেডরুমে যাই  । বেডরুমে ঢুকেই দেখি অনয় ঘুমুচ্ছে । বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, বউটা কোথায়, কি করতেছে কোন চিন্তা নাই । থাক, ঘুমাক । এই বাড়ির সবাই শান্তি মতো ঘুমায়, আমার ঘুম আসে না । কি করা যায়? ড্রেসিং টেবিল এর সামনে বসলাম অনেক দিন পড় । মনটা কেমন জানি ছিল, আরও কেমন জানি হয়ে গেল । বয়সের ছাপ পড়ে যাচ্ছে মুখে, কি বিপদ । কেবল তো ৩৫ ই পার করতে পারলাম না । হবেই না কেন? রাতের পর রাত জেগে থাকলে তো অবস্থা এইরকম হবেই । ঘুম না হওয়ার একটা ব্যবস্থা হওয়া দরকার । ডাক্তার দেখালাম তো অনেক । লাভ হয় না, খালি গাদা গাদা ঘুমের ট্যাবলেট পেটে পুরে দেয়া হয়, ঘুম আমার আসে না ।
সমস্যাটা আমার আসলে মানসিক । খুব ছোট একটা সমস্যা, আবার অনেক বড় । অনেকদিন আগের একটা ঘটনা খুব ঝামেলা করছে, ইচ্ছা করলেই ছেঁটে ফেলা যায় । কিন্তু পারতেছি কোথায়? নিজের উপর নিজের বিরক্তি বাড়ছে । সমস্যাটা আমার ভার্সিটি লাইফের । তখন ছোট ছিলাম, বাস্তব বুঝতাম না । দেখতে ভয়াবহ রূপসী ছিলাম, অনেক কিছু এড়িয়ে চলতে পারতাম । স্টেজে আগুন ঝরানো পারফরমেন্স দিতে পারতাম, ভাল পড়াশুনা করতে পারতাম । অনেক কিছুই করতে পারতাম । কিন্তু অনেক কিছু বুঝতে পারতাম না । বুঝতে পারতাম না, এই বয়সে একটা ছেলের প্রেমে পাগলের মতো পড়লে কি হয় । এখন বুঝি । এখন বুঝি, মানুষের বেঁচে থাকাটা আসলে কতো বীভৎস । তখন এগুলা কিছুই বুঝতাম না । বুঝি নাই, দুইটা মানুষ নিয়ে একটা পৃথিবী তৈরি করলে কি ধরনের বিপদ হতে পারে । হ্যাঁ আমি সব করতে পারি এই মানুষটা একটা সময় আর কিছুই করতে পারি নি । কারন, আমার আর কিছুই করতে ভালো লাগতো না । আমার আশে পাশের মানুষদের অসহ্য মনে হতো । তারা যে আমার ভালো চাইতো না, তা না । সবাই আমাকে সেই পুরনো ফর্মে দেখতে চাইছিল । দুই একজন ছিল যারা আমার ভয়াবহ শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল । তারা মনে করত আমি তাদের অনেক কাছের মানুষ ছিলাম । পুরাই ভুল ধারনা । আমার কাছের কোন কাছের মানুষ ছিল না, না, শুধু একজনই ছিল, যাকে আমি ভালবাসতাম । অন্যদের সাথে শুধু ভদ্রতা করে কথা বলতাম । বুঝতে পারি নাই কি পরিমান অসুস্থ ছিলাম সেই সময় । আমি বুঝি নাই, নিজের পৃথিবী নিজেই ছোট করে আনলে একটা সময় গভীর খাদে পড়ে যেতে হয় । হ্যাঁ আমি কূপের অতল গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিলাম । কতোটুকু ভালবাসলে একটা মানুষের জন্য এতো পাগল হতে পেরেছিলাম আমি? অবাক লাগে আজকাল ।

আমি জানতাম ওদের বাসায় হয়ত আমাকে মেনে নিবে না । ছেলে ডাক্তার ছেলের বউ তো ডাক্তার হতেই হবে । কি বিপদ আমি ডাক্তার হবো কেমনে?? আরো অনেক কিছু হতে হবে । একটা মানুষকে পেতে হলে কেন এতো কিছু হতে হবে?
আমি সেই সময় এতো কিছু বুঝি নাই । আবেগের বশে অন্ধ ছিলাম, দিন দিন আরো অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম । আমি যে দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছি সেইটা তখন বুঝি নাই । সব মানুষকে আসলে বুঝা যায় না । আমিও বুঝি নাই । আমি শুধু নিজের দিক দিয়ে সব কিছু দিয়ে যাচ্ছিলাম । একটা মেয়ে হিসাবে আমি যা কিছু দিয়েছি ঐ বয়সে আমার চিন্তা করলেও গা শিউরে ওঠে । হা, আমি ওর থেকে ৩৫০ কি মি দূরে থাকতাম । তাই বলে তাকে কি আমার দেখতে ইচ্ছা করবে না, হাতটা ধরার ইচ্ছা করবে না? এই হাত ধরার ইচ্ছাটা যে কখন গভীর শারীরিক সম্পর্কে রুপ নিয়েছে বুঝে উঠতে পারি নাই । মানুষটাকে বুঝতে পেরেছিলাম এই রকম একটা ঘটনা এর মধ্যে দিয়ে । আমি মনে করেছিলাম, ছেলে ডাক্তারি পড়ে, বুঝতে পারবে একটা মেয়ে কতোটুকু কষ্ট পায় তার লাইফ এর ফার্স্ট টাইম কারো সাথে এইরকম গভীর সম্পর্কে গেলে । না সে বুঝে নাই, এইটা নাকি তার মাথায় ছিল না । যে কষ্ট টা আমি পেয়েছিলাম, আমার সারা জীবন মনে থাকবে । আমার সেই দিন ই উচিত ছিল, ওকে একটা লাথি দিয়ে নিজের জীবনটা কে লাইন এ নিয়ে আসা । কেন জানি পারি নাই, আজো বুঝতে পারি না । মানুষ টাকে অনেক বেশি ভালবাসতাম । তাই সুযোগ দেয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম । ওইটাও আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল শেষ পর্যন্ত ।
প্রত্যেক বার ভালোবাসার আশ্বাস নিয়ে বুকে বিশাল পরিমাণ ভালবাসা নিয়ে আমি ৩৫০ কি মি একা একা একটা মেয়ে তার কাছে যেয়ে কি পেতাম? কিছুই পেতাম না । পেতাম রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সারা শরীরে তীব্র ব্যথা । নিজের কাছে নিজেকেই অদ্ভুত বলে মনে হতো । যেন, আমি একটা মাংসের টুকরা, সেইটা নিয়ে একটা কুকুর কামড়াকামড়ি করতেছে । আমার কোন কিছুই তার ভালো লাগতো না, শুধু ভালো লাগতো এই চকচকা শরীরটা । এইরকম শারীরিক নির্যাতন করা আমার কেন, কোন মেয়ের পক্ষেই সম্ভব না । প্রত্যেক বার শারীরিক মিলন আমার কাছে এক একটা ধর্ষণ এর সমান মনে হতো । আমি এই ভয়াবহ অত্যাচার সহ্য করে নিতে চাইছিলাম, কারন ওকে আমি ভালবাসতাম । প্রত্যেকবার একি ঘটনার পুনরক্তি আর ঘটনার পর ওকে যেভাবে ক্ষমা চাইতে দেখতাম, আমি একটু হলেও স্বপ্ন দেখতাম ওকে নিয়ে, ঘর বাধার । কিন্তু এতো কিছুর পরেও আমাকে যে পরিমাণ মানসিক অত্যাচার সে করছিল সেগুলা আর মনে করতে চাই না । এতো কিছু করে কি হবে? কি হয়েছিল আসলে আমার? সব মিলায়ে আসলে কিছুই হয় নাই । আমার জীবন থেকে মূল্যবান দুইটা বছর চলে গিয়েছিল, আমার সত্তা নামক জিনসটা চলে গিয়েছিল । পুরুষজাতির উপর আমার বিশ্বাস নামক জিনিসটা উঠে গিয়েছিল । নতুন করে কাউকে ভালোবাসার ইচ্ছাটা বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল । আর কি? কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে পড়াশুনাটা শেষ করে ফেলেছিলাম বলে রক্ষা । আশে পাশে কিছু মানুষ ছিল যারা আমাকে বেশ ভালো সাপোর্ট দিয়েছিল সেই সময়টায় । না হলে হয়ত হতাশায় কবেই কোথায় হারিয়ে যেতাম । সেই মানুষ গুলার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ ।

লেখাপড়া শেষ করে, বাবা মা ধরে বেঁধে একটা সুপাত্র দেখে কন্যা দান করলেন । সুপাত্র হল মি অনয় কুমার পাল । আমি আবিষ্কার করলাম, সব ছেলে এক রকম্ না । অনয় ছেলেটা এতো বেশি ভালো, আমাকে কখনই জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি, আমার অতীত কি? আমি জীবনে যা চেয়েছি, সেইটা অনয়ের কাছ থেকে পেয়েছি । ভালবাসা পেয়েছি, কেয়ার পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি, পরম নির্ভরতা পেয়েছি । আর বিনিময়ে অনয়কে আমি কি দিয়েছি?
না কিছুই দিতে পারি নাই । আজো ভালবাসতেই পারলাম না । প্রত্যেকবার যখন স্বামী স্ত্রী হিসেবে আমরা যখন অন্তরঙ্গ কিছু মুহূর্ত কাটাই, তখন নিজেকে খুব ভালো অভিনেত্রী বলে মনে হয় । ভালবাসা জিনিসটা আসলে আমাকে দিয়ে আর হবে না । বিয়ের এতগুলা বছরপরেও তাই আমি নিজেকে ভয়ংকর অপরাধী বলে মনে করি । এই অপরাধবোধ আমার অতীত কে নিয়ে নয়, অতীত কে ভুলতে না পেরে বর্তমানের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে না আক্ষেপ আমাকে কুড়ে কুড়ে খায় । প্রতিনিয়ত অভিনয় করতে করতে আমি ক্লান্ত । ইচ্ছা করেসব কিছু ছেড়ে একা কোথায়ও পালিয়ে যাই । বাচ্চা ছেলেটার মামনি ডাকটা মাথায় অ্যালার্ম বেল এর মতো বেজে ওঠে । এতো মানসিক স্ট্রেস আমাকে ঘুমাতে দেয় নাই প্রায় দশ বছর হচ্ছে । আমি তো আর পারছিনা । কি করা উচিত আসলে আমার? আত্মহত্যা করবো? না, ওটা করতে চাইলে অনেক আগেই করতে পারতাম আমি । কি করবো আমি এখন? কবে একটু শান্তি করে ঘুমুতে পারবো?

কিছু স্মৃতি,কিছু আর্তনাদ।” সম্পর্কে ৩টি মন্তব্য

  1. লেখাটা ভালো, শুধু ভালো না – বেশ ভালো । কমেন্টে কি বলবো, ভেবে পাচ্ছিনা – কিন্তু এরকম একটা গল্প পড়ে লেখককে তার লেখনীর জন্য ধন্যবাদ-টা না দিলেও হয় না । “ধন্যবাদ” 🙂

মন্তব্য করুন