ক্লান্তি

অভিক ভাইয়া, ম্যাথটা হচ্ছে না, দেখেন তো কি ভুল করলাম । কি জানি একটা চিন্তা করছিলাম । প্রমির কথায় চিন্তায় ভয়াবহ ব্যাঘাত ঘটলো । মেজাজ টাই খারাপ । আরো খারাপ হল খাতার দিকে তাকিয়ে । এই গাধার বাচ্চা করছে টা কি? এরে এতদিন কি পড়ালাম । যাই হোক, মেজাজ খারাপ করে আজকের দিনে বউ রে গালি দেয়া যায়, মারধোর ও করা যায়, কিন্তু টাকার গাছ সুন্দরী ছাত্রীরে গালি দিলে মনেই দিতে হয় । বাহিরে প্রকাশ করা যায় না । ভদ্রলোকের মতো তৃতীয়বারের জন্য একই ম্যাথটা আবার নিজের হস্তে করে দিলাম এবং সাথে একটা তেলতেলে হাসি যেন তুমিই তো করলা আমি খালি চেয়ে চেয়ে দেখলাম ।

 প্রমিদের এই ফ্ল্যাটটা এগারো তলা । আমি এখন পাঁচ তলায় একটা বারান্দা ওয়ালা রুমে বসে আছি । রুমটা প্রমির । এই রকম একটা রুম এ বসে দুনিয়া আলাদা দুনিয়া আলাদা একটা ভাব চলে আসে । আমার কেন যেন আসছেনা । আসলে কখনই আসে না । আমার মাথায় আপাতত কালি মাখা একটা প্যান্ট আর একটা পঁচা সাবান । আমার সুস্থ সবল কাপড় ওই একটা ব্লু জিন্স । সেইটা সস্তা কলমের কালি দিয়া  মাখামাখি হয়ে বাজে অবস্থায় আছে । আমার কাজ হচ্ছে দুই বেলা কালি কিভাবে তোলা যায় এইটা নিয়ে গবেষণা করা । গত তিন দিন যাবত এই কাজ করে যাচ্ছি । লাভ হচ্ছে না, হবে বলে মনেও হচ্ছে না । এইটার অবস্থা আসলে আমার কপালের মতোই । দিনের পর দিন শুধু ঘষেই যাচ্ছি, লাভ হয় না ।

 গাধাবুদ্ধি ছাত্রীর ডাকে পুনরায় সম্বিৎ ফিরলো । “ভাইয়া আপু কেমন আছে? “ এতক্ষণ পর আমার মুখে একশ ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠলো । গাধাবুদ্ধি কে রীতিমত প্রণাম করার ইচ্ছা হল । মেয়েটাকে পড়াতে আসাটা একে বারে ঘোড়ার আণ্ডা টাইপ এর কাজ বলে মনে হচ্ছে না । এই মেয়ে জিনিস । ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসের নাম মুখে আনছে । আপু নামক এই জিনিসটা আমার মেয়েবন্ধু । সস্তা কথায় গার্লফ্রেন্ড । আমার জীবনের এই একটা ভালো জিনিস আছে যেইটা মনে হলেই ডুগডুগি বাজাতে ইচ্ছা করে । আমার ছাপোষা অবস্থা, দিন আনে দিন খাই এই দিন গুলার একমাত্র সঙ্গীর কথা মনে হলে ভালই লাগার কথা । মেয়েটার সবচেয়ে বড় গুন হচ্ছে ও আজকাল কার মেয়েদের মতো না । খিদে লাগলে চেচায় না, কান্না লাগলে কান্না করেনা তা না, এসব ই ঠিক ই করে, কিন্তু সে আলাদা । আমার অবস্থাটা সে বোঝে, একটু বেশি বোঝে । এই কারনেই আমাদের প্রেম নামক জিনিসটা বড়লোকের রংচঙা হোটেল এ করতে হয় না, পার্কের বেঞ্চিতে দু পয়সার বাদাম খেতে খেতে আমরা গল্প করি । দিনশেষে কখনো যদি  মন খারাপ হয়, ওর চোখের পানি মোছার জন্য আমার সস্তা শার্ট ই যথেষ্ট । ভালোবাসা তো আর এই বুকে কম জমা নাই?

অনেকক্ষণ পরে ছাত্রীর জবাব দিলাম । “হ্যাঁ, অর্নিলা ভালো আছে, তবে ইদানীং ঘ্যান ঘ্যান একটু বেশি করে” । এই কথায় এই পিচ্চি যে কি মজা পেল বুঝতে পারলাম না । বড়লোকের মেয়ে, কি বলতে যে কি বোঝে আমি কিভাবে বুঝবো । মাস গেলে গাদা খানেক টাকা পাই, সেইটার একটা বড় অংশ মা এর কাছে পাঠিয়ে দিয়ে আমি চুপচাপ । বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এইটাই আমার রুটিন । মাসের শেষ দিকটা কাটে আমার মেসের পাশে লেংড়া কুকুরটার মত । সেও ঘুর ঘুর করে খাবার খোজে আমিও খুজি, কোনদিন খাই, কোনদিন অল্প খাই এইভাবেই চলে । মাঝে মাঝে ভাবি আমার তো অর্নিলা আছে, এই কুকুরটার কি আছে? একটা সময় আমার কত প্রতিভা ছিল ।   ভালো গান গাইতে পারতাম , কবিতা লিখতে পারতাম । এখন তো কিছুই নাই, আছে শুধু মাস শেষে ফাঁকা পকেট ।

এই অতীত রোমন্থন আমার জন্য সুখকর নয়, মাথাটা ধরে বসলো । তবুও ছাত্রীর কাছ থেকে  হাসিমুখে বিদায় নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে রাস্তায় হাঁটছি । নিয়ন আলো আর মাথার তীব্র যন্ত্রণা সব মিলিয়ে একটা ঘোর লাগা পরিবেশ । রাত কম হয় নাই । আমি তাও হাটাহাটি চালিয়ে যাচ্ছি । শহরের দোকানগুলা একটার পর একটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে এই মহাকালে আমি একা হয়ে গেছি আর এই দোকান গুলা এক একটা মানুষের জীবন । এক একটা মানুষ তার জীবনের বেচাকেনা  শেষ করে সব দায়িত্ব মিটিয়ে অন্য কোথায় চলে যাচ্ছে । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজ আমি ক্লান্ত । হাজার বছরের চেনা এই রাস্তায়  হাঁটতে হাঁটতে আমি ভীষণ ক্লান্ত । জীবনের এই বেচাকেনা টা মিটিয়ে দিতে পারলে কি এমন ক্ষতি হতো?

ক্লান্তি” নিয়ে একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন