না, করিমের বাড়িতে..

আনন্দগড়ের ছোট রেলওয়ে স্টেশন । বিদ্যুৎ পৌছায়নি এখনো । হারিকেনের মৃদূ আলোতে অন্ধকার কিছুটা ফিকে হলেও কেমন যেন চোখে ধাঁধাঁ লাগে । আজ অমাবশ্যা, গাঢ় অন্ধকারে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে । হারিকেনের আলো যতটুকু ছড়াচ্ছে দৃষ্টির সীমা ঠিক ততটুকুই । এই মৃদূ আলোর জন্যই হয়তো বাইরের দিকটা একটু বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে ।
স্টেশন মাস্টারের রুমের দরজাতে নড়বড়ে এক তালা ঝুলছে । দেখেই বোঝা যায় ভেতরে দামী অথবা গোপনীয় কিছু নেই । আর তা না হলে এলাকার মানুষ একটু বেশিই সৎ বলে মনে করতে হবে । যাই হোক, সামনে একটা বেঞ্চ পাতা আছে । আর একপাশে একটা হারিকেন মুমূর্ষু রোগীর মত জ্বলছে ।
স্টেশনের দু’তিন মাইলের মধ্যে তেমন কোন লোকালয় নেই । নতুন কিছু বসতি গড়ে ওঠা শুরু হয়েছে কেবল । সপ্তাহে একটা মাত্র ট্রেন এখানে থামে । আর এদিন লোকের ভীড় একটু বেশিই হয় । এলাকাটা তখনই কেবল গম গম করে । অস্থায়ী কিছু চা-বিড়ির দোকানও বসে এসময় । আজও যথা সময়ে সবাই হাজির হয়েছিল । তবে ট্রেন সময়মত না আসার কারণে সবই ভেস্তে গেছে ।
কি একটা সমস্যার করণে আজকের ট্রেনটা সময় মত আসতে পারেনি । দুপুরের ট্রেন এসেছে রাত দুটোয় । বাইরে থেকে আসা যাত্রীও আজ নেই বললেই চলে কারণ অনেকের ক্ষেত্রে একজনকে উপেক্ষা করা দোষের কিছু নয় । অন্তত এই গনতান্ত্রিক দেশে । যাই হোক, আজ একজনই ট্রেনে চেপে এসেছে । বাড়ি তার এখান থেকে পাঁচ কি ছ’ কিলো ভিতরে । পথ ভালো থাকলে হয়তো এটাও চিন্তার ব্যাপার নয় । কিন্তু বাড়ি যাবার পথে তাকে একটা নদীও পার হতে হবে যা এত রাতে বিনা নৌকায় অসম্ভব; অন্তত মাসুদের জন্য তাই । ট্রেন আসতে দেরি হওয়ায় এবং সঙ্গী হিসেবে কাউকে না পাওয়ায় বাড়ি যাওয়ার চিন্তাটা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়েছে ।
কিছুটা হতাশায় এবং কিছুটা ঘুমের ঝুলে বড় একটা হাই তুলে পেতে রাখা বেঞ্চটার দিকে এগুলো মাসুদ ।
‘এটাতে বসেই রাত কাটাতে হবে । ’ মনে মনে ভাবল সে । জমে ওঠা ¬ ধূলোর আস্তরণ ঝেড়ে ফেলে তাতে আরাম করে চেপে বসল । আশার বিষয়, কালি ধরা হারিকেনটা টিপ টিপ করে জ্বলছে তখনও । মাসুদ উঠে গিয়ে হারিকেনের জোরটা বাড়িয়ে দিল । তারপর অসংখ্য তারাভরা আকাশটাই তার এ যাত্রার সঙ্গী । এভাবে কতক্ষণ অতিবাহিত হয়েছে তা বোঝার উপায় ছিল না ।
– এত রাতে এখানে বসে কি করেন?
প্রশ্নকর্তার কণ্ঠ অপরিচিত ।
– ঘুমাই
ঘোরের মধ্যে উত্তর দিল মাসুদ ।
– ট্রেন আসতে দেরি হয়েছে বুঝি? বাড়ি কি ভেতরের দিকে?
এত রাতে অপরিচিত একটা লোকের এতগুলো প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল না মাসুদ । লোকটা কেমন তাও যখন তার অজানা তখন কি করে তার কাছে সব কথা বলা যায় ভেবে পাচ্ছে না সে । যে যুগ যামানা পড়েছে তাতে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে কেউ ক্ষতি ছাড়া ভালো করতে চায় না । অন্য কোন সময় হয়তো লোকটাকে এড়িয়ে যেত মাসুদ । তার উপর গ্রামের অশিক্ষীত লোকদের উপর কিছুটা আস্থা আছে । বলল-
হ্যা, বাড়ি ভিতরের দিকেই । ট্রেনটা আসতে দেরি করল আর সাথেও কেউ ছিল না তাই…..
– বুঝেছি, মাসুদের কথার মাঝখানেই বলে উঠল লোকটা । ‘তা বাড়ি কতদূর ভাইজানের ?’
– সোনাখালের ওপারে, মিয়া বাড়ি ।
– চিনছি, সে তো মেলা পথ । এসময় তো যাওয়াও সম্ভব না ।
– সে জন্যই তো এখানে বসে রাতটা কাটিয়ে দেব ঠিক করেছি ।
– এভাবে কি রাত কাটানো যায়, চলেন; আমার সাথে চলেন ।
– কোথায়?
– আমার বাড়িতে । বেশি দূর না এইতো সামনেই ।
এমন একটা সময়ে অপরিচিত কারো এমন প্রস্তাব গ্রহণ করার মত লোক মাসুদ না, কিন্তু কি কারণে যেন লোকটার কোন কথাই ফেলা সম্ভব হচ্ছে না । ফলে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল মাসুদ । কিন্তু মনের ভেতর জাগতে লাগল নানা রকম প্রশ্ন ।
হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল লোকটা? কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে কিনা কে জানে, ইত্যাদি ।
‘আমি স্টেশন দেখাশুনা করি, নাম করিম মিয়া । ’ মাসুদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর জন্যই যেন পরিচয় দিল সে । পিছু পিছু হাটছে মাসুদ । বিস্ময়ের ব্যপার হল লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছেনা । গামছা দিয়ে মুখটা এমন ভাবে ঢাকা যে, ভালো করে দেখার উপায়ও নেই । হারিকেনের আলোর তেজও ছিল কম ফলে আশে-পাশে কোন কিছুই ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না । বেশ কিছু দূর আসার পর একটা কুঁড়ের অবয়ব স্পষ্ট হল । একটাই ঘর ।
– আপনার পরিবার…?
– ‘কেউ নেই । ’ মাসুদের প্রশ্ন শেষ না হতেই বলে উঠল করিম মিয়া । ‘আপনি বসেন আমি আসছি । দেয়াশলাই আর প্রদীপটা বেড়ার পাশেই আছে । ’
মাসুদের কথা বলার সময় না দিয়েই বেরিয়ে গেল করিম । মাসুদ এতে অনেকটাই বিরক্ত হল । কাউকে মেহমান করে ডেকে এনে আলো পর্যন্ত না ধরিয়ে কেউ যে এভাবে চলে যেতে পারে? কি আর করা বিপদে পড়লে অনেক কিছুই সহ্য করতে হয় । হাতড়ে-হাতড়ে প্রদ্বীপ আর দেয়াশলাই বের করে আগুন জ্বালল মাসুদ । তেল খুবই অল্প, তলানির মত জমে আছে । সারা গা ধুলোয় ভরা । বহুদিন যাবৎ পরিত্যক্ত থাকলে যেমনটি হয় । ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে একটা পানির কলস কাত হয়ে পড়ে আছে, বেড়ায় এক গোছা পাটের দড়ি আর কিছু ভাঙা পাতিল । বহুকাল ধরে এখানে কেউ থাকে না বলেই মনে হয় ।
‘আপনি কি এখাইে থাকেন?’ পশ্ন করার পর মনে পড়ে সে এখানে নেই । মনে মনে চিন্তিত হয়ে পড়ে মাসুদ । এই নির্জনে একা কাউকে রেখে কেউ যে উধাও হতে পারে তা ওর জানা ছিল না । যেখানেই যাক ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই ।
রাত পার হয়ে যাচ্ছে অথচ লোকটার কোন খোঁজ নেই । বসে থেকে কতক্ষণ কাটানো যায় । মনে মনে ভীষন বিরক্ত হয় মাসুদ ।
গরমের বেলা, পাঁচটা বাজতেই অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে কিন্তু করিম আর আসে না । ‘কি জানি লোকটার কি হল, কিন্তু আর যে থাকা চলে না, এবার বাড়ির পথ ধরতে হবে । ’ উঠে দাড়ায় মাসুদ । পথটা মনে আছে ফলে বের হয়ে আসতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তার । বড় রাস্তায় উঠতেই গাঁয়ের এক পরিচিত লোকের সাথে দেখা । লোকটা অবাক চোখে মাসুদকেই দেখছে । মাসুদদের প্রতিবেশি, কিন্তু ওভাবে তাকিয়ে কেন লোকটা?
– আমাকে চিনতে পারেননি চাচা? আমি মাসুদ ।
– চিনেছি, তা এদিকে কোথা থেকে এলে?
– করিম মিয়ার ওখানে রাত্রে ছিলাম ।
এবার তো লোকটা একেবারে হা হয়ে গেল ।
– বল কি বাপু! করিমের ওখানে ছিলে? সে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?
– হ্যা, কিন্তু আমাকে রেখে লোকটা যে তখুনি কোথায় উধাও হয়ে গেল বলতে পারব না ।
– উধাও হয়ে গেল? কিন্তু করিম তো প্রায় বছর খানেক আগে রেলের চাকায় কাটা পড়েছিল । আগে ও ই স্টেশন দেখাশুনা করতো এখন আমি করি ।
মাসুদ শিউরে উঠল । তবে সে কার সাথে ওখানে গেল? কার সাথে কথা বলল? কার বাড়িতে রাত কাটাল?
মাসুদ ভুতে বিশ্বাস করে না । কিন্তু এ সব কি করে ঘটতে পারে? তবে কি সত্যই…… কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব? একটা মানুষ এক বছর আগে মারা যাওয়ার পর সে কি করে…… নাহ, কিছুই ভাবতে পারছে না মাসুদ ।

এমন সময় পাশ থেকে কে যেন বলল ‘কি ব্যাপার, ভাইজান কি সারা রাত এইখানেই ছিলেন?’
ধড়ফর করে ওঠে মাসুদ । ঘোর কাটতেই দেখল- সে স্টেশনের সেই নড়বড়ে বেঞ্চে বসে আছে । হারিকেনটা তখনো মিটমিট করে জ্বলছে । সকাল হয়ে গেছে । সারা শরীর ঘামে ভেজা । সামনে প্রশ্নকর্তা উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে । মাসুদ বলল-
না, করিমের বাড়িতে ।

নাম: মোঃ সাইফুল্লাহ হাবীব / লেখালেখির নাম: সাইফ আলি / পিতা: মো: আশরাফুল ইসলাম / মাতা: শাহানারা খাতুন / জন্ম: ১৫, জুন, ১৯৯০; ঝিনাইদহ সদরে / বর্তমান অবস্থান: বি. এফ. এ. সম্মান (৩য় বর্ষ), অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগ, চরুকলা অনুষদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / প্রকাশিত বই: আমি আকাশ দেখতে যাবো (একুশে বইমেলা, ২০১২)

মন্তব্য করুন