হাসপাতালের দারোয়ান ( অতীন্দ্রিয় গল্প )

হাসপাতালের হৃদরোগ ওয়ার্ডের দারোয়ান দেলোয়ার হোসেন । মধ্য বয়স্ক মানুষ । চাকরির বয়সও অনেক হয়েছে । হাসিখুশি অমায়িক চরিত্রের এক মানুষ । তার কাজ ওয়ার্ডের গেটে বসে থাকা আর অসময়ে আসা অবান্চিত দর্শনার্থীদের আটকে দেওয়া । মাঝে মধ্যে ডাক্তারদের ফাই ফরমাশও করতে হয় । প্রতি সপ্তাহে একদিন আর সরকারি ছুটি ছাড়া, অসুস্থ না হলে এভাবে বছরের প্রতিটি দিন সে ওয়ার্ডের কলাপসিবল গেটের সামনে বসে ডিউটি করে ।
আজ তার ডিউটি নাই তবুও গেটের সামনে রাখা টুলে বসে আছে । এমন সময় দেখল হার্ট ইনটেভসিভ কেয়ার রুম থেকে এক লোক বেরিয়ে এল । কিছুক্ষণ আগে তার আত্মিয়রা ষ্ট্রেচারে করে এনেছে । লোকটাকে দেখে দেলোয়ার হাসতে হাসতে বললঃ কি ভাই চলে যাছ্ছেন ? এই মাত্রত এলেন ।
লোকটি বিষন্ন কন্ঠে বললঃ হ্যা ভাই চলে যাছ্ছি । জানিনা সামনে কি আছে । যাই দোয়া করবেন ।
ঃযান ।
দেলোয়ার এই বলে হাত নাড়ল । মনে মনে ভাবতে লাগল এই মাত্রত এল । কতক্ষন হবে এই দশকি পনের মিনিট । এর মধ্য চলে গেল । সে আগে এসব দেখত না । এখন প্রতিদিন একজন দুজন করে চলে যেতে দেখে । কোন কোন দিন আট দশজন ও আসে আর যায় । আজ কয়েকদিন যাবৎ সে এই সব দেখতে পাছ্ছে ।
হাসপাতালের এই চাকরিতে প্রথম যখন আসে, তখন সে ছিল নদীর পাড় ভাংগা ভিটে মাটি হারানো এক যুবক । যার কোন কুলে কেউই নাই । পাড় ভেংগে নদী সব নিয়ে যাওয়ার সময় সেই ঘরের সাথে বিধবা বৃদ্ধা মাকেও নিয়ে গেছে । দেলওয়ার মায়ের পাশেই শোয়া ছিল, গভীর রাতে নদী তাদের ঘরকে যখন গ্রাস করে তখন ঘরের সাথে দেলোয়ার আর তার মাও নদী পড়ে যায় । গভীর রাতে শুধু মায়ের একটা আর্তচিৎকারই শুনতে পায় । বাবা দেলোয়ার তুই কই ……. ? তারপর নদীর গর্জনে আর ঢেউয়ে মাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে । অনেক খুজেছে নদীর পাড় ধরে মাইলের পর পর মাইল হেটেছে যদি জীবিত মা বা তার কবরটা পাওয়া যায় এই আশায় ।
অনেক খুজেও না পেয়ে হতাশ হয়ে, এর কয়েক মাস পর ঢাকায় চলে আসে । গ্রামের ছেলে ঢাকা শহরের ব্যাস্ততায় কয়েকদিনেই হাপিয়ে উঠে । একসময় আর সহ্য করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে চট্টগ্রামে চলে আসে । এখানে এসেত সে অবাক! কি সুন্দর নদী ঘেরা পাহাড়ের বুকে শুয়ে আছে যেন শান্ত-স্নিগ্ধ শহরটি ।
হাসপাতালের লিফটের দরজা দিয়ে ষ্ট্রেচারে করে এক মহিলা রুগী এল । আত্মিয় স্বজনরা তাড়াতাড়ি করে দৌড়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে নিয়ে গেল । মহিলা না বলে তরুনী বলা ঠিক হবে । খুবই সুন্দরী ।
দেলোয়ারের বউয়ের কথা মনে পড়ে গেল । তার বউটা চিটাগুনিআন লোকাল মেয়ে । লোকাল হওয়াতে সেকি অহংকার । বিয়ের প্রথম কয়েক মাস লাজুক থাকলেও পরে কিছুটা মুখরা যায় । দেলোয়ারকে কথায় কথায় বৈংগা বলে ডাকত । যদিও বউয়ের মুখে বৈংগা ডাকটা খুবই উপভোগ করত । বউ যখইন বৈংগা বলে ডাকে সে তখন মিটিমিটি হাসে । অনেক সময় বউকে রাগানোর জন্য বলে ফেলেঃ তুমি কি ? তুমিত বৈংগার বউ ।
এখানকার লোকাল লোকেরা আগে খুবই আত্মগরিমায় ডুবে থাকত এখন আর তেমন নেই । তবে আগেকার লোকাল লোক গুলো খুব বড় মনের ছিল । বিয়ের আগে দেলোয়ার তার শ্বশুরের বাসায় ভাড়া থাকত । দেলোয়ারের শান্ত স্বভাব আর সৎচরিত্র দেখে তার শ্বশুর তাকে খুবই পছন্দ করত । পরবর্তিতে সেই পছন্দ থেকেই দেলোয়ারকে নিজের ছোট মেয়ের জামাই করে নিলো ।
ইনটেনসিভ কেয়ারের ওদিক থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতেই বুজতে পারল আরেকজন গেল । সাথে সাথে দেখল সুন্দর তরুনী মেয়েটা বিষন্ন পায়ে গেটের দিকে হেটে আসছে । মেয়েটির বিষাদ মাখা চেহারা দেখে দেলোয়ারের বুকটা মোচর দিয়ে উঠল । মেয়েটা গেটের সামনে আসতেই বললঃ কি মা চলে যাছ্ছেন ?
মেয়েটির বিষাদের মেঘে ছেয়ে যাওয়া মুখ বেয়ে নেমে এল নোনা জলের ধারা । দাড়িয়ে দুই হাতে মুখ ধেকে হু হু কাদতে লাগল আর বললঃ হা বাবা চলে যাছ্ছি আর কোনদিন ফিরব না । জানিনা আমার তিন বছরের বাচ্চাটার কি হবে । আমার কলিজার টুকরাটা বুবলী কার বুকে মুখ গুজে আবদার করবে । কান্না করলে কে ওকে কোলে নিয়ে শান্ত করবে?
এই বলতে বলতে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল ।
দেলোয়ারের মনটা খারাপ হয়ে গেল । হায়, কি মানুষের জীবন । একটা নিশ্বাসের চিরতরে শুধু থেমে যাওয়া ।
মন খারাপ করে চুপ করে বসে রইল । আবার শোনা গেল কান্নার রোল । দরজার দিকে তাকাতেই দেখল ইয়া মোটাসোটা এক লোক বেরিয়ে আসছে । হতবিহ্বল চেহারা । গভীর চিন্তায় মগ্ন । দেলোয়ার হাসি মুখে তাকিয়ে বললঃ কি ভাই আপনি ও চলে যাছ্ছেন ।
লোকটা দেলোয়ারের দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন লোকটার বর্তমান অবস্থার জন্য ওই দায়ি । কোন উত্তর না দিয়ে লোকটা বের হয়ে গেল ।
দেলোয়ার এই হাসপাতালে চাকরি নেওয়ার পর থেকে মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মূহুর্তটিকে খুব কাছ থেকে দেখছে আজ অনেক বছর । পৃথীবির মাঝে বোধহয় হাসপাতালই একমাত্র জায়গা যেখানে জীবন মৃত্যুর অবস্থান যেন চিকন এক সুতার এপার ওপার । এখানে যেমন আছে ফিরে পাওয়ার সুখ তেমন আছে হারানোর দুঃখ ।
কত মানুষ তাদের আপনজনদের নিয়ে আসে । কঠিন রোগে ছটফট করছে সেই আপনজন । হয়ত কেউ হাসি মুখে যায় আর কেউ যায় লাশ আর চোখ ভরা পানি নিয়ে । না জানি কত দিনের প্রিয় এই সাথি আজ তাদের ছেড়ে চলে গেল । রেখে গেল বুক ভাংগা বিরহ আর হাহাকার অনেকের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যত । কত মা তার প্রিয় সন্তানকে, কত অবুঝ শিশু তার প্রিয় বাবাকে, কত প্রেয়সী তার প্রিয়তমকে, বোন তার ভাইকে এখান থেকে চিরবিদায় দিয়েছে তার কোন লেখাজোখা নাই ।
একজন মানুষ তার জীবনের সময়ের প্রতি মুহূর্তকে ব্যাবহার করে সাজিয়ে তোলে যে সংসার মৃত্যুর সাথে সাথে সেই মানুষটির নিজস্ব বলে আর কিছুই থাকেনা । এমনও হয় এই হাসপাতাল থেকে নিজের ঘরেও ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয় না । হাজার টাকা দিয়ে বানান সুখের বিছানায় আর শোয়ারও সুযোগ হয় না মাটির বিছানা আর ঘাসের বালিশ হয় তার আসবাব । কীটপতঙ্গ পোকামাকড় হয় তার সঙ্গী সাথি । গহীন কাল আঁধার হয় তার ঘরের আলো ।

দেলোয়ারের বুকটা আবার একটু একটু ব্যাথা করতে লাগল । ওর মনে পড়ল এইত কয়েকদিন আগে তারও বুক ব্যাথা হয়েছিল । বাম দিকে ব্যাথা শুরু হল, সারা গায়ে পাতলা ঘাম দেখা দিল । মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল সেই সাথে বমি বমি ভাব । ও সাথে সাথে বুঝতে পারল ওর হার্ট এ্যাটাক হছ্ছে । কোন রকমে শুধু বলতে পারল আমাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চল । তারপর আর কিছুই মনে নাই । এরপরই ও নিজেকে এই টুলে বসা অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে । দেলোয়ার নিজে অসু্স্থ হয়েছে এতটুকু মনে আছে । কিন্তু এই টুলে কি করে এল এটা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না । এই টুলে নিজেকে আবিষ্কার করার পর থেকে যা দেখছে সবই কেমন যেন অদ্ভুত । রোগীগুলো কেমন যেন । আসে ষ্ট্রেচারে করে দুই চার মিনিট পরই একা হেটে হেটে বের হয়ে যায় । এখান থেকে যাওয়ার সময় সাথে আসা আত্মিয় স্বজন কাউকে আর দেখা যায় না । ওদের হাটা ও কেমন যেন অদ্ভুত । হাটছে না যেন উড়ছে ।
দেলোয়ার নিজের এই অদ্ভুত ভাবনা দেখে নিজেই নিজেকে বকা দিল । কি আবোল-তাবোল ভাবছে সে । সেদিন অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সব কিছুই কেমন যেন বদলে গেছে । এখন আবার বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে । উফ ব্যাথাটা অসহ্য হয়ে উঠছে । আশে পাশে কেউতো নাই । চির পরিচিত ডেটলের গন্ধটাও নাকে লাগছে না । পুরো হাসপাতালটা কেমন যেন নীরব আর খালি । দেলোয়ারের নিজের দেহটাকে কেমন যেন অসম্ভব ভারী মনে হছ্ছে ।
হার্ট ইনটেনসিভ কেয়ারের ডাক্তার আর নার্সদের মধ্যে হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল । তাদের দীর্ঘ দিনের সহকর্মী দেলোয়ার আজ কয়েকদিন যাবৎ এখানে কোমায় শুয়ে আছে । তারা বুঝতে পেরেছে দেলোয়ার কোমায় থাকা অবস্থায় আবার ষ্ট্রোক করছে । তার সহকর্মীরা সবাই যেন পন করেছে, তাদের দীর্ঘ দিনের সহকর্মী দারোয়ান দেলোয়ারকে যে ভাবেই হোক বাচাতে হবে ।

মন্তব্য করুন