বর্ণিল সৌরভ

সকাল থেকেই সৌরভের উপর মেজাজ খারাপ বর্ণার । খবরটা দেওয়ার জন্য এতবার ফোন দিচ্ছে এরপরে ও ফোন ধরে না গাধাটা । হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ এরপরে দরজার আওয়াজ । আর সৌরভের সারপ্রাইজ ভিজিট । অন্যদিনের চেয়ে ওকে আজকে একটূ খুশি মনে হচ্ছে । পাঞ্জাবি টাঞ্জাবি পরে খুব সাজগোজ করে আসলে ও উত্তেজনার বশে খেয়াল করে না বর্ণা ।

সৌরভঃ আজকে তোকে একটা কথা বলব ।
বর্ণাঃ আমিও তোকে একটা কথা বলব ।
সৌরভঃ তুই আগে বল । লেডিস ফার্ষ্ট বলে একটা কথা আছে না ।

বর্ণাঃ আমার না বিয়ে ঠিক হয়েছে । ছেলে আমেরিকা থাকে । টেক্সাস ইউনিভার্সিটির টিচার । সামনের মাসে দেশে আসবে । এরপরের পরের মাসে আমরা টেক্সাসে চলে যাব । ভাবতেই ক্যামন জানি লাগছে । কিরে তুই চুপ কেন?

সৌরভঃ (আমতা আমতা ভাবে) না মানে, শুনছিলাম তোর কথা ।

বর্ণাঃ তোর চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে খুশি হস নাই । হিংসা লাগতেছে নাকি? কিরে তোর হাতে গোলাপ কেন?

সৌরভঃ (আমতা আমতা ভাবে) না মানে এমনিতেই রাস্তা দিয়ে আসার সময় কিনতে ইচ্ছে করল, কিনে ফেললাম এই আর কি ।

বর্ণাঃ এটা আমাকে দে । ফুলদানিতে রেখে দেই । তুই ছেলে মানুষ গোলাপ দিয়ে কি করবি । যাহোক, এবার তোর কথা বল ।

সৌরভঃ বাদ দে । আজকে তাড়া আছে ।

—————-

 

বর্ণাঃ তাহলে জার্মান চলে যাচ্ছিস শিওর ।
সৌরভঃ হুম, এখন পর্যন্ত তো তাই জানি ।
বর্ণাঃ আমেরিকার সাথে জার্মানের টাইপ গ্যাপ কেমন রে?
সৌরভঃ ঐখানে বিকাল ৪ টা মানে জার্মানে ১১ টা । কেন রে?
বর্ণাঃ না মানে তোকে ফোন টোন দিতাম ঐ অনুযায়ী তাহলে । আচ্ছা তুই জার্মান গিয়ে কি করবি বল তো ।
সৌরভঃ (বোকার মত বলে) একটা গিফট শপ দিব । আমার দোকানে গিফট দিয়ে ভালবাসার মানুষকে কনভিন্স করবে সবাই ।

(হা হা করে হেসে উঠে বর্ণা)

বর্ণাঃ তুই দিবি গিফট শপ । আর ‘ভালবাসার মানুষ’!!!! তুই ভালবাসার বুঝোসটা কি বল তো একটু, শুনি ।

(হঠাৎ কথা আটকে যায় সৌরভের)

সৌরভঃ (আমতা আমতাভাবে) না মানে তুই ও থাকতে পারিস তাহলে আমার সাথে । তুই তো এইসব বুঝিস । আমার সাথেই থাকিস সারাজীবন । তোকে ৫০% শেয়ার দিয়ে দিব আমার গিফট শপের ।

বর্ণাঃ হে হে তোর সাথে সারা জীবন । আমি কি পাগল নাকি? শোন গাধা, তোর আর আমার লাইফষ্টাইল পুরাই আলাদা । আমার লাইফ যদি হয় গোধুলির ছায়া তাহলে তোর লাইফটা হচ্ছে মধ্যরাতের অন্ধকার । এখন তুই ই বল শেষ বিকালের ছায়া আর মধ্যরাতের অন্ধকারকে কি কখনো এক করা যায়?

সৌরভঃ মানুষ চাইলে সব পারে । তুই আমি চাইলে ও পারব ।

বর্ণাঃ না এত পারা লাগবে না । এইসব থিওরি বাদ দিয়ে এইবার লাইফ নিয়ে একটূ সিরিয়াস হ । নাহলে পরে তোর জন্য পাত্রী খুজে পাব না কিন্তু ।

সৌরভঃ (বিড়বিড় করে)পাত্রী খোজার কি দরকার । আয়নার সামনে দাড়ালেই তো হয় ।

বর্ণাঃ কি বললি বুঝি নাই । একটু জোরে বল ।

সৌরভঃ না কিছু না, চল তোকে বাসায় পৌছে দেই ।

…………………..

(১০ বছর পরে)
সময়ঃ বিকাল ৪ টা
স্থানঃ টেক্সাস

প্রতিদিন এই সময়টায় বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে ঘুরতে আসে বর্ণা । দুইটা পিচ্চির একজনের বয়স সাত, একজনের চার বছর । রিসার্চের কাজে স্বামী ধ্রুব ব্যস্ত সব সময় । সরকারের কি যেন একটা সিক্রেট প্রজেক্টে কাজ করছে তাই বাসায় এসে ও খুব বেশী কথা বলে না । তাই সংসারে খুব বেশী সময় ও দিতে পারে না ।

তাই তাকেই সংসারের প্রায় সব কিছুই গোছাতে হয় । ব্যস্ত জীবন, একটু ও ফুরসত নেই । যদিও প্রাচুর্য্যের অভাব নেই জীবনে তবু কেন জানি এখনো একটা গিফট শপের ৫০% পাওয়ার লোভটা প্রতিদিন জেগে উঠে । বর্ণা এ জীবনটা থেকে বের হতে চায় । অনেক চেষ্টা করে, তবু পারে না ।

………………

সময়ঃ রাত ১১ টা
স্থানঃ মিউনিখ

মিউনিখের ব্যস্ত মোড়েই এই গিফট শপটার নাম ‘বর্ণা’ । মিউনিখের বেশীরভাগ মানুষই এই নামের মানে বুঝে না তবু এই গিফট শপটাতে সব সময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভীড় লেগেই থাকে । বন্ধু কিংবা ভালবাসার মানুষকে কনভিন্স করার জন্য এখানকার গিফটগুলো সব বয়সী মানুষের কাছে সমাদৃত ।

প্রতিদিনের মত আজকে ও ১১ টার সময় দোকান বন্ধ করল সৌরভ । দোকানে থাকার সময়টা অনেক ভাল কাটে । যখন ভালবাসার মানুষগুলো একজন আরেকজনকে খুশি করার চেষ্টা করে এই দৃশ্যগুলো বিশেষ করে ।

মিউনিখের রাস্তা দিয়ে হাটছে সৌরভ । দোকান বন্ধ করার পর থেকে বাসায় যাওয়ার সময় প্রতিদিন এ সময়টা ভেতরে একটা অন্যরকম কষ্ট কাজ করে । ৩ কিলোমিটার পথ হেটে বাসায় যায় । পাশ দিয়ে একটার একটা বাস কিংবা ট্যাক্সি চলে যায় । তবু সে হেটেই যায় ।

আশেপাশের মানুষ যারা একটু খেয়াল করে তারা দেখে সৌরভ চোখ বন্ধ করে হাটছে । তবে কেউ ই যেটা দেখে না সেটা হচ্ছে মনে মনে নাম না জানা একজন মেয়ের হাত ধরে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তা ধরে হাঁটে ।

……………………

শেষ কথাঃ

দুজন মানুষ, একই সময়ে পৃথিবীর প্রায় দু প্রান্তে দাঁড়িয়ে একে অপরের কথা ভাবছে । একজন দেখছে গোধুলির আলো আর অন্যজন মধ্যরাতের আকাশ । দুজনের কেউ জানে না এই গোধুলি আর মধ্যরাতকে কিভাবে এক করা যায় । তবু দুজনেই দুজনকে মিস করছে । প্রতিদিনই মিস করে ।

এভাবেই দুজন মানুষের প্রতিদিনের গল্প না বলাই থেকে যায় । কেউ জানে না এই গল্প । উপরের গল্পটা খুবই কমন একটা গল্প । কারণ পৃথিবীতে এরকম দুজন মানুষদের সংখ্যা অনেক । আকাশের তারাদের মত এরা জ্বলজ্বল করে, ভেতরে একরাশ কষ্ট নিয়ে ।

বর্ণিল সৌরভ” সম্পর্কে ২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন